ঢাকা ১০:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে ধস: রাস্তা ও নদীর পাশে ফেলে রাখা হচ্ছে কোরবানির চামড়া

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৫:২৩:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
  • ১৮৪ Time View
Print

আজহারুল ইসলাম সাদী, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টারঃ

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন সাধারণ মানুষ ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। কাঙ্ক্ষিত দাম
না পেয়ে কেউ রাস্তার পাশে, কেউ আবার নদীর তীরে ফেলে রেখে যাচ্ছেন কাঁচা চামড়া।

শুক্রবার (২৯ মে) দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, কোরবানির পশুর চামড়ার ন্যায্য দাম না পাওয়ায় হতাশায় ভুগছেন সংশ্লিষ্টরা। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করায় তারা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন।

রাজধানীর পোস্তা এলাকার চামড়ার বাজারে বড় গরুর একটি ভালো মানের চামড়ার দাম সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা পর্যন্ত বলা হচ্ছে। সামান্য কাটা বা ছিদ্র থাকলে সেই দাম নেমে আসছে ১০০ থেকে ২০০ টাকায়। এতে পরিবহন ও শ্রমিক খরচও উঠছে না বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।

সাতক্ষীরা, খুলনা, বরিশালসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এমন চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর সরকারের পক্ষ থেকে দাম নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে সেই দামে চামড়া কেনা হয় না। সিন্ডিকেট ও ক্রেতা সংকটের কারণে চামড়ার বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

শ্যামনগরের কয়েকজন মৌসুমি ব্যবসায়ী জানান, লবণ ও পরিবহন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেকেই ৫০০ থেকে ৮০০ টাকায় গরুর চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার কোথাও কোনো ক্রেতা না থাকায় চামড়া পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, রাস্তাঘাট ও নদীর পাশে চামড়া ফেলে রাখায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও বাড়ছে।

এদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ট্যানারি মালিকদের অনাগ্রহ, বাজারে নগদ অর্থের সংকট এবং সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে দেশের চামড়া শিল্প বড় ক্ষতির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

সাতক্ষীরায় কোরবানি দেওয়া পশুর চামড়া বিক্রি করতে না পেরে অনেকেই মাটিতে পুঁতে ফেলছেন। জেলার বিভিন্ন এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়ানোর আশঙ্কায় কেউ কেউ চামড়া ফেলে দিচ্ছেন নদী বা পুকুরপাড়ে। এতে পরিবেশ দূষণের শঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

সাতক্ষীরা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এফ এম মান্নান কবীর বলেন, “চামড়া একটি জাতীয় সম্পদ। এভাবে চামড়া নষ্ট হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। চামড়া সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত লবণ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং দ্রুত ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে আড়তদারদের সমন্বয় করা জরুরি।”

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরেও একই চিত্র দেখা গেছে। বাড়ি বাড়ি ঘুরে চামড়া সংগ্রহ করা মৌসুমি ব্যবসায়ীরা রাস্তার পাশে চামড়ার স্তূপ নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্রেতার অপেক্ষায় বসে থাকলেও কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না। অনেকেই বাধ্য হয়ে কম দামে চামড়া বিক্রি করছেন।

সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায়ও চামড়ার বাজারে ব্যাপক মন্দা দেখা দিয়েছে। কোরবানির পর থেকেই বিভিন্ন এলাকায় চামড়া সংগ্রহ শুরু হলেও ক্রেতার সংখ্যা ছিল খুবই কম। কোথাও কোনো ব্যবসায়ী না আসায় অনেকেই উপজেলা সদরে চামড়া নিয়ে গেলেও সেখানেও ভালো দাম পাননি। কেউ কেউ হতাশ হয়ে চামড়া ফেলে রেখে চলে গেছেন।

চট্টগ্রামেও পুরোনো সংকট ফিরে এসেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা শত শত চামড়া নিয়ে আড়তে গিয়ে বিক্রি করতে না পেরে অনেকে নামমাত্র দামে চামড়া ছেড়ে দিয়েছেন। কেউ আবার রাস্তার পাশেই ফেলে রেখে চলে গেছেন।

প্রতি বছর কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে চামড়ার বাজার ঘিরে বড় অঙ্কের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকলেও সঠিক ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ সুবিধা ও বাজার নিয়ন্ত্রণের অভাবে এ খাত বারবার সংকটে পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Tag :
About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

ঝিনাইদহে অবৈধ ভিওআইপি সরঞ্জামসহ ২ জন আ,টক

কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে ধস: রাস্তা ও নদীর পাশে ফেলে রাখা হচ্ছে কোরবানির চামড়া

Update Time : ০৫:২৩:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
Print

আজহারুল ইসলাম সাদী, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টারঃ

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন সাধারণ মানুষ ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। কাঙ্ক্ষিত দাম
না পেয়ে কেউ রাস্তার পাশে, কেউ আবার নদীর তীরে ফেলে রেখে যাচ্ছেন কাঁচা চামড়া।

শুক্রবার (২৯ মে) দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, কোরবানির পশুর চামড়ার ন্যায্য দাম না পাওয়ায় হতাশায় ভুগছেন সংশ্লিষ্টরা। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করায় তারা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন।

রাজধানীর পোস্তা এলাকার চামড়ার বাজারে বড় গরুর একটি ভালো মানের চামড়ার দাম সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা পর্যন্ত বলা হচ্ছে। সামান্য কাটা বা ছিদ্র থাকলে সেই দাম নেমে আসছে ১০০ থেকে ২০০ টাকায়। এতে পরিবহন ও শ্রমিক খরচও উঠছে না বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।

সাতক্ষীরা, খুলনা, বরিশালসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এমন চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর সরকারের পক্ষ থেকে দাম নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে সেই দামে চামড়া কেনা হয় না। সিন্ডিকেট ও ক্রেতা সংকটের কারণে চামড়ার বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

শ্যামনগরের কয়েকজন মৌসুমি ব্যবসায়ী জানান, লবণ ও পরিবহন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেকেই ৫০০ থেকে ৮০০ টাকায় গরুর চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার কোথাও কোনো ক্রেতা না থাকায় চামড়া পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, রাস্তাঘাট ও নদীর পাশে চামড়া ফেলে রাখায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও বাড়ছে।

এদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ট্যানারি মালিকদের অনাগ্রহ, বাজারে নগদ অর্থের সংকট এবং সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে দেশের চামড়া শিল্প বড় ক্ষতির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

সাতক্ষীরায় কোরবানি দেওয়া পশুর চামড়া বিক্রি করতে না পেরে অনেকেই মাটিতে পুঁতে ফেলছেন। জেলার বিভিন্ন এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়ানোর আশঙ্কায় কেউ কেউ চামড়া ফেলে দিচ্ছেন নদী বা পুকুরপাড়ে। এতে পরিবেশ দূষণের শঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

সাতক্ষীরা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এফ এম মান্নান কবীর বলেন, “চামড়া একটি জাতীয় সম্পদ। এভাবে চামড়া নষ্ট হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। চামড়া সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত লবণ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং দ্রুত ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে আড়তদারদের সমন্বয় করা জরুরি।”

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরেও একই চিত্র দেখা গেছে। বাড়ি বাড়ি ঘুরে চামড়া সংগ্রহ করা মৌসুমি ব্যবসায়ীরা রাস্তার পাশে চামড়ার স্তূপ নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্রেতার অপেক্ষায় বসে থাকলেও কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না। অনেকেই বাধ্য হয়ে কম দামে চামড়া বিক্রি করছেন।

সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায়ও চামড়ার বাজারে ব্যাপক মন্দা দেখা দিয়েছে। কোরবানির পর থেকেই বিভিন্ন এলাকায় চামড়া সংগ্রহ শুরু হলেও ক্রেতার সংখ্যা ছিল খুবই কম। কোথাও কোনো ব্যবসায়ী না আসায় অনেকেই উপজেলা সদরে চামড়া নিয়ে গেলেও সেখানেও ভালো দাম পাননি। কেউ কেউ হতাশ হয়ে চামড়া ফেলে রেখে চলে গেছেন।

চট্টগ্রামেও পুরোনো সংকট ফিরে এসেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা শত শত চামড়া নিয়ে আড়তে গিয়ে বিক্রি করতে না পেরে অনেকে নামমাত্র দামে চামড়া ছেড়ে দিয়েছেন। কেউ আবার রাস্তার পাশেই ফেলে রেখে চলে গেছেন।

প্রতি বছর কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে চামড়ার বাজার ঘিরে বড় অঙ্কের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকলেও সঠিক ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ সুবিধা ও বাজার নিয়ন্ত্রণের অভাবে এ খাত বারবার সংকটে পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।