

রিপন শান, নিজস্ব প্রতিবেদক:
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে জাতীয় কবিতা পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের এক মতবিনিময় সভা গতকাল রাত ৮টায় বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়।
এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ।
মতবিনিময় সভায় জাতীয় কবিতা পরিষদের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন—পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান, সাধারণ সম্পাদক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন, উপদেষ্টা ও বর্ষীয়ান কবি মতিন বৈরাগী, কবি ও সাংবাদিক আবু সাঈদ খান। এছাড়া কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কবি এবিএম সোহেল রশিদ, কবি শ্যামল জাকারিয়া, কবি নুরুন্নবী সোহেল, কবি ইউসুফ রেজা, কবি শাহিন চৌধুরী, কবি আসাদ কাজল, কবি জামসেদ ওয়াজেদ, কবি রোকন জোহর, কবি শিমুল পারভীন ও কবি নাহিদ হাসান।
সভায় সূচনা বক্তব্যে কবি মোহন রায়হান নেতৃবৃন্দের পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেন,“১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার—সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে, অর্থাৎ শোষণ, নিপীড়ন, দুর্নীতি ও বৈষম্যমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে জাতীয় কবিতা পরিষদ ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আপনার নেতৃত্বে বিএনপি জনগণের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা আমরা রাখি।”
তিনি আরও বলেন,“বাংলাদেশের প্রগতিশীল কবিরা ব্যক্তিগত কোনো সুবিধা চান না; তারা চান জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা, বাকস্বাধীনতা ও কলমের স্বাধীনতা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে সাম্প্রদায়িক উগ্র গোষ্ঠীর ভয়াবহ উত্থান শুরু হয়েছে। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করতে চায়, হাজার বছরের বাংলা সংস্কৃতিকে অস্বীকার করে তার অগ্রযাত্রা রুদ্ধ করতে চায়। তারা সাংস্কৃতিক সংগঠন ও গণমাধ্যমের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো জঘন্য অপরাধ সংঘটিত করেছে। নারীর ক্ষমতায়ন ও অধিকার হরণ করার অপচেষ্টা চলছে। এই অন্ধকার শক্তির বিরুদ্ধে কবিরা প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চায়।”
তিনি এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে জানিয়েছেন,
“‘সংস্কৃতিবিরোধী উগ্রতা রুখে দেবে কবিতা’—এই স্লোগানে আগামী ১ ও ২ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘জাতীয় কবিতা উৎসব ২০২৬’। আমরা চাই বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির উত্তরোত্তর বিকাশ। সে লক্ষ্যেই বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি ও শিশু একাডেমির মতো একটি ‘কবিতা ভবন’ এবং ‘কবিতা একাডেমি’ প্রতিষ্ঠার দাবি জানাচ্ছি। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে কবিদের এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সহযোগিতা পাওয়ার আশাবাদ রাখি।”
জাতীয় কবিতা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন বলেন,
“বিগত সরকারের সময় দলদাস কবিরা জাতীয় কবিতা পরিষদকে একটি দলীয় অঙ্গসংগঠনে পরিণত করেছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর প্রতিষ্ঠাকালীন কবিরা পুনরায় কবিতা পরিষদকে দেশ ও জনগণের স্বপ্ন–আকাঙ্ক্ষার পরিপূরক একটি স্বাধীন সাংস্কৃতিক সংগঠনে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে।”
তিনি আরও বলেন,
“শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর সারাদেশের শিল্পকলা একাডেমিকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি এবং কবি, লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছি। এ সময় তারেক রহমানের কাছে কৃষিকার্ড ও পরিবারকার্ডের পাশাপাশি একটি ‘শিল্পী–সাহিত্যিক কার্ড’ চালুর প্রস্তাবও উত্থাপন করেছি।”
পরিষদের উপদেষ্টা বর্ষীয়ান কবি মতিন বৈরাগী বলেন,
“আমরা কেবল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চাই, লেখার স্বাধীনতা চাই—এর বাইরে আর কিছু নয়।”
উপদেষ্টা লেখক ও সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন,
“অতীতে যেমন দেখেছি, বর্তমানেও তেমনি সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের ওপর মালিকপক্ষ এবং সরকার—উভয়েরই চাপ বিদ্যমান। এই পরিস্থিতিতে স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। আমরা বিএনপির কাছে দলনিরপেক্ষ, স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের পৃষ্ঠপোষকতা প্রত্যাশা করি।”
সব বক্তব্য মনোযোগসহকারে শোনার পর তারেক রহমান বলেন,
“আমাদের পুরনো ধ্যান-ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে জনগণের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে—যেখানে সবার অধিকার নিশ্চিত হবে। আমাদের পরিকল্পনায় পাঠ্যসূচিতে অন্যান্য বিষয়সহ নাচ, গান, কবিতা, আবৃত্তি ও শিল্পকলার বিভিন্ন দিক এবং খেলাধুলা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিষয়ভিত্তিক প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠান নতুন কুঁড়িকে বহুমাত্রিক রূপ দেবে।”
তিনি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের দৃষ্টান্ত স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন,
“জিয়াউর রহমান একদলীয় শাসনের দমন থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রকে মুক্ত করেছিলেন এবং বাক, ব্যক্তি ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর সময়ে বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমি, নজরুল ইনস্টিটিউটসহ ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজেট বৃদ্ধি ও উন্নয়ন সাধিত হয়। তিনি প্রথম নজরুল মিউজিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা পরবর্তীতে নজরুল ইনস্টিটিউটে রূপান্তরিত হয়। শিশুদের প্রতিভা বিকাশে বিটিভিতে ‘নতুন কুঁড়ি’ অনুষ্ঠান চালু ছিল এক যুগান্তকারী উদ্যোগ।”
তিনি আরও বলেন,“বেগম খালেদা জিয়া নারীশিক্ষা বিস্তার ও নারীকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এবং শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে দল-মত নির্বিশেষে উদার পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেছেন। যদি আমরা জনগণের রায়ে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পাই, তাহলে কবিতা ভবন বা কবিতা একাডেমি প্রতিষ্ঠা কোনো কঠিন বিষয় হবে না। দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অগ্রযাত্রায় সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে। লেখক, কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরা যেন স্বাধীনভাবে তাদের ভূমিকা পালন করতে পারেন—সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।”
সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার–১ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থীও উপস্থিত ছিলেন।
Leave a Reply