
নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানী ঢাকার সাভার উপজেলার আশুলিয়া বাজারের পূর্ব পাশে, সিরাজের ইটভাটার দক্ষিণে গড়ে উঠেছে দুটি অবৈধ সীসা উৎপাদন কারখানা। অভিযোগ রয়েছে, এসব কারখানায় পুরাতন ব্যাটারি পুড়িয়ে সীসা উৎপাদন করা হচ্ছে, যা স্থানীয় পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে কোনো ধরনের পরিবেশগত অনুমোদন ছাড়াই কারখানাগুলোতে পুরাতন ব্যাটারি ভেঙে ভেতরের সীসা আলাদা করে আগুনে গলিয়ে পুনর্ব্যবহারযোগ্য সীসা তৈরি করা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া আশপাশের পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত করছে এবং কৃষিজমি, গাছপালা ও স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অভিযোগ অনুযায়ী, অবৈধ সীসা কারখানা দুটির মালিক গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলার মো. শাজাহান আলী, মো. মহসিন আলী, মো. আলমগীর হোসেন ও মো. মিলন মিয়া। স্থানীয়দের দাবি, তারা দীর্ঘদিন ধরে পুরাতন ব্যাটারি সংগ্রহ করে রাতের আঁধারে তা পুড়িয়ে সীসা উৎপাদন করে আসছেন। গত শনিবার (১৪ মার্চ) সরেজমিনে দেখা যায়, দুটি কারখানায় মোট চারটি চুলা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। চুলার পাশে কয়েকজন শ্রমিক পুরাতন ব্যাটারির প্লেট কেটে আলাদা করে স্তূপ করে রাখছিলেন। জানা যায়, রাতে কাঠ ও কয়লার আগুনে এসব প্লেট জ্বালিয়ে সীসা উৎপাদন করা হয়। কারখানার আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ব্যাটারির ভাঙা অংশ, অ্যাসিডযুক্ত মাটি এবং কালো ধোঁয়ার চিহ্ন সহজেই চোখে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দিনের তুলনায় রাতেই এসব কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম বেশি চলে। রাতভর জ্বলতে থাকা চুলা থেকে ঘন কালো ধোঁয়া বের হয়ে আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, যা শিশু, নারী ও বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালা ও নানা শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি করছে। একাধিক স্থানীয় ব্যক্তি জানান, পুরাতন ব্যাটারি পোড়ানোর ফলে নির্গত ধোঁয়ায় সীসা, অ্যাসিডসহ বিভিন্ন ভারী ধাতব পদার্থ বাতাসে মিশে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন সীসার সংস্পর্শে থাকলে কিডনি, স্নায়ুতন্ত্র, ফুসফুস ও রক্তের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। শিশুদের ক্ষেত্রে মানসিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। স্থানীয় কৃষকরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের ভাষ্য, কারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও বর্জ্য আশপাশের জমিতে পড়ছে, ফলে মাটির উর্বরতা কমে যেতে পারে। বৃষ্টির সময় এসব রাসায়নিক পদার্থ পানির সঙ্গে মিশে খাল-বিল ও জলাশয়ে প্রবেশ করলে মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি হবে। পরিবেশ সচেতন মহলের মতে, এ ধরনের অবৈধ সীসা উৎপাদন কারখানা শুধু পরিবেশ আইন লঙ্ঘনই নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে নীরব অপরাধ। তারা দ্রুত প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, কারখানাগুলো দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে মালিকপক্ষ আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এলাকাবাসীর আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এলাকাবাসী। তারা অবিলম্বে অবৈধ সীসা কারখানা বন্ধ, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পকারখানা পরিচালনা সম্পূর্ণ বেআইনি। বিশেষ করে পুরাতন ব্যাটারি থেকে সীসা আহরণের সময় নির্গত বিষাক্ত বর্জ্য যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে তা আশপাশের পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারখানার মালিক মো. শাজাহান আলীর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। অপরদিকে মো. মহসিন আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট কিছু কর্তৃপক্ষ ও সাংবাদিককে ‘ম্যানেজ’ করেই কারখানার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এলাকার সচেতন মহল ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে অবৈধ সীসা কারখানা দুটি উচ্ছেদ করতে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার, বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তর এবং সাভার উপজেলা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। পরিশেষে, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, এই অঞ্চলে পরিবেশ দূষণ ভবিষ্যতে ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
Leave a Reply