
এম.এ আরিফ চৌধুরী, স্টাফ রিপোর্টার:
বাংলাদেশের উন্নয়ন, অবকাঠামোগত অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি আরেকটি ভয়াবহ সংকট নীরবে সমাজের ভেতর শেকড় গেড়ে বসছে—ইয়াবার বিস্তার। একসময় সীমিত পরিসরে থাকা এই মাদক এখন দেশের শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। তরুণ সমাজের একটি অংশ, শ্রমজীবী মানুষ, এমনকি বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিরাও এর ভয়াবহ প্রভাবের মুখোমুখি হচ্ছেন। বিষয়টি কেবল আইনশৃঙ্খলার নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, পরিবার, শিক্ষা, অর্থনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত একটি বহুমাত্রিক সংকট।
ইয়াবা মূলত একটি শক্তিশালী উত্তেজক মাদক। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, দীর্ঘদিন এটি সেবনের ফলে মানুষের ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ, আচরণগত পরিবর্তন, স্মৃতিশক্তির অবনতি এবং বিভিন্ন মানসিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে কর্মক্ষমতা কমে যায়, পারিবারিক সম্পর্ক ভেঙে পড়ে এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। একজন মানুষের আসক্তি ধীরে ধীরে পুরো পরিবারকে মানসিক ও আর্থিক সংকটে ঠেলে দেয়।
বাংলাদেশে মাদকবিরোধী অভিযান বহুবার পরিচালিত হয়েছে। বিপুল পরিমাণ ইয়াবা জব্দ হয়েছে, অসংখ্য মামলা হয়েছে এবং অনেক অপরাধী আইনের আওতায় এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—শুধু আইন প্রয়োগ কি যথেষ্ট? বাস্তবতা বলছে, মাদক সরবরাহ বন্ধের পাশাপাশি মাদকের চাহিদা কমানোর দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, চাহিদা থাকলে নতুন নতুন চক্র তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও থেকে যায়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মাদকাসক্তির পেছনে শুধু কৌতূহল নয়; বেকারত্ব, হতাশা, মানসিক চাপ, পারিবারিক অস্থিরতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং সহজলভ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন বহুমাত্রিক পরিকল্পনা। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সচেতনতা—সবগুলো বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনায় আনতে হবে।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনও দেশের অনেক মানুষের নাগালের বাইরে। অনেকেই বিষণ্নতা, উদ্বেগ কিংবা মানসিক সমস্যায় ভুগলেও চিকিৎসা নেন না বা নিতে পারেন না। ফলে কেউ কেউ ভুলভাবে মনে করেন, মাদক সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু সেই সাময়িক অনুভূতিই শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ আসক্তিতে রূপ নেয়। তাই জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি।
পরিবারের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, তাদের বন্ধুমহল সম্পর্কে খোঁজ রাখা, আচরণের পরিবর্তন লক্ষ্য করা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত পরামর্শ গ্রহণ—এসব পদক্ষেপ অনেক বড় বিপদ এড়াতে সাহায্য করতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মাদকবিরোধী সচেতনতা কার্যক্রম, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ রোধে আধুনিক প্রযুক্তি, গোয়েন্দা নজরদারি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় আরও শক্তিশালী করতে হবে। মাদক পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও কার্যকর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি আর্থিক লেনদেন, অবৈধ নেটওয়ার্ক এবং সংগঠিত অপরাধ দমনে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
গণমাধ্যমেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন, সচেতনতামূলক প্রতিবেদন, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং সফল পুনর্বাসনের গল্প তুলে ধরার মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। একইভাবে ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রাষ্ট্রের উচিত একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা, যেখানে প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন, গবেষণা, জনসচেতনতা এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগ—সবগুলো বিষয় সমন্বিতভাবে থাকবে। পাশাপাশি তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ইতিবাচক সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে তারা মাদকের পরিবর্তে সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যেতে পারে।
ইয়াবা কোনো একক ব্যক্তির সমস্যা নয়; এটি একটি জাতীয় চ্যালেঞ্জ। এই সংকট মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রতিরোধই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। আজ যদি আমরা সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করি, তবে আগামী প্রজন্মকে একটি সুস্থ, নিরাপদ ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ উপহার দেওয়া সম্ভব হবে।
মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু অভিযান পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি, মানবিক পুনর্বাসন, শক্তিশালী সামাজিক সচেতনতা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। একটি সুস্থ জাতি গঠনের জন্য তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার হওয়া উচিত।