
সিনিয়র রিপোর্টার, মোঃ জাহাঙ্গীর আলম রাজু:
গাজীপুরের কালিয়াকৈরে চলমান “কালিয়াকৈর শিল্প ও বাণিজ্য মেলা-২০২৬” ঘিরে ক্রমেই বাড়ছে জনঅসন্তোষ। মেলায় প্রতিদিন উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সাউন্ড সিস্টেম, ডিজে সাউন্ড ও মাইকের ব্যবহারকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, জেলা প্রশাসনের অনুমোদনের শর্ত এবং সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে রাত পর্যন্ত উচ্চ শব্দে অনুষ্ঠান পরিচালনা করা হচ্ছে, যার ফলে একদিকে যেমন ভয়াবহ শব্দ দূষণ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ মে গাজীপুর জেলা প্রশাসনের অনুমোদনে “সৈয়েদুর রহমান ট্রেডিং কোম্পানি (SRTC)”-এর নামে এ মেলার আয়োজন করা হয়। তবে অনুমোদনের শর্তাবলি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মেলা কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মেলার অতি নিকটেই অবস্থিত ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি অব বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত উচ্চ শব্দে গান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং মাইকের ব্যবহার তাদের স্বাভাবিক পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন,
“বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা ও একাডেমিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে। কিন্তু মেলার বিকট শব্দের কারণে পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।”
শুধু শিক্ষার্থীরাই নন, আবাসিক এলাকার বাসিন্দারাও চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলা শব্দ দূষণের কারণে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা জব্বার মিয়া বলেন,
“এভাবে প্রতিদিন বিকট শব্দে অনুষ্ঠান চলতে থাকলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন অসম্ভব হয়ে যাবে। আমরা শান্তিতে বিশ্রাম নিতে পারছি না। প্রশাসনের উচিত দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমাত্রার শব্দ মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শিক্ষার্থীদের মনোযোগ কমে যায়, শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয় এবং হৃদরোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, যখন সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকার আশপাশে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানের কথা বলছে, তখন কীভাবে একটি বাণিজ্য মেলায় প্রকাশ্যে উচ্চ শব্দে অনুষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে? অনুমোদনের শর্ত বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি কোথায়?
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বাণিজ্যিক কার্যক্রম সীমিত রাখার কথা থাকলেও মেলায় রাত পর্যন্ত অনুষ্ঠান চলতে দেখা যাচ্ছে। এতে প্রশাসনিক নির্দেশনার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে মেলার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা মো. মাহবুবুর রহমানের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। অন্যদিকে মেলার পরিচালক সৈয়েদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,
“মেলার বিষয়টি মাহবুব দেখছেন। তার সঙ্গে কথা বলেন। আমি বর্তমানে অসুস্থ।”
এরপর তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এ বিষয়ে কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ এইচ এম ফখরুল হোসাইন বলেন,
“মাঠ প্রশাসনের জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী উপজেলার বিভিন্ন শপিংমল ও মার্কেট নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বন্ধ রাখার নির্দেশনা রয়েছে। সরকারি নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। মেলা কর্তৃপক্ষকেও একই নিয়ম মেনে চলতে হবে। অন্যথায় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকার নিকটে আয়োজিত এ ধরনের মেলায় শব্দ নিয়ন্ত্রণ, সময়সীমা মেনে কার্যক্রম পরিচালনা এবং অনুমোদনের শর্ত কঠোরভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
তাদের মতে, বাণিজ্যিক স্বার্থের চেয়ে শিক্ষার পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তাই কালিয়াকৈর শিল্প ও বাণিজ্য মেলায় সরকারি শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।