
আওরঙ্গজেব কামালঃ বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক দৃশ্যপট ক্রমেই উত্তপ্ত ও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে নানা কর্মসূচি ঘোষণা করছে, যা বাস্তবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর
বদলে অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে তুলছে। জুলাই অভ্যুথানের পর দেশের মধ্যে চলছে এক ধরনের অস্থিরতা । প্রতিনিয়ত লাশের শারিতে যুক্ত হচ্ছে অনেকে। দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এখন মুখ খুলতে শুরু করেছে জনসাধারন। প্রতিনিয়ত খুন,চাঁদাবাজী,দখলবাজী,দব্যের মুল্য উদ্ধগতি ও রাজনৈতি অস্থিরতায় দেশের মানুষ নাজেহাল হয়ে পড়েছে। বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলি যে কি চায় তা তারা নিজেরাই জানেনা। এখন আবার কথা উঠেছে স্ধাধীনতা বিরোধীদের
নির্বাচন করতে না দেওয়ার জন্য।অনেকে জামান নিষিদ্ধের দাবী করছেন। এছাড়া অনেকে বলছেন,নির্বাচনে সকল দলের অংশ গ্রহনের সুযোগ দেওয়া উতিচ। যারা অপরাধী তাদের বাদ দিয়ে নির্বাচনে সকল দলকে সুযোগ দিতে হবে তা না হলে নির্বাচন নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারে। অনেকে বলছে যে দোষ আওয়ামী লীগ করেছে গত ১৫ বছর যাব আবারো সেই দোষ সরকার করতে পারে না। একটি নিরপেক্ষ সরকার অবশ্যই একটি অবাধ ষষ্ঠ নির্বাচনের লক্ষ্যে সকল দলের অংশগ্রহণ করাটাই তাদের মূল দায়িত্ব কর্তব্য। হয়তো আওয়ামীলীগ কে একেবারে নিষিদ্ধ করতে হবে। তা না হলে তাদেরকে নির্বাচন অংশগ্রহণ করতে দিতে হবে। ফ্যাসিবাদী ওই দলটি যারা জুলাই অভ্যুত্থানের হাজারো মানুষের রক্ত ঝরিয়েছে তাদের বিচার হওয়াটাই স্বাভাবিক। এদের থেকে যারা অর্থ লুটপাট করেছে তাদেরকেও কঠিন শাস্তি দিতে হবে এবং নির্বাচন থেকে বাইরে রাখতে হবে। আমি আওয়ামীলীগের কথা বলছি না। বলছি অন্যান্যর যেসব রাজনৈতিক দলগুলো রয়েছে সেগুলো কে নির্বাচন মুখি করা। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে যে ধরনের পক্ষে বিপক্ষে সমালোচন চলছে সেটা অত্যান্ত দুঃখজনক। বর্তমানে গণভোটকে কেন্দ্র করে দলগুলোর বিরোধ এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কোনো একটি সিদ্ধান্ত বা প্রক্রিয়া নিয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুরু হওয়ায় আসন্ন নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এন সি পি ও জামাত ইতিমধ্যে নির্বাচন নিয়ে এবং নির্বাচন কমিশন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের দাবি তারা একটি পক্ষের হয়ে কাজ করছে।
গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একই দিনে
হওয়ায় তা নিয়ে অনেক রাজনৈতিক দল ভিন্ন প্রতিক্রিয়া ব্যাক্ত করেছেন।অনেকে
আশঙ্কা করছেন—আগামী নির্বাচনে যে দল পরাজিত হবে, তারা এই ফলাফলকে
প্রত্যাখ্যান করে নির্বাচনকে ‘অসুষ্ঠ’ বলেই আখ্যা দেবে। এই সম্ভাবনা
বাস্তব রাজনীতির মাঠে আজ খুবই স্পষ্ট। বিএনপি ও তার সমমনা দল নিয়ে একদিকে এবং জামায়াত তার ৮ দলীয় জোট নিয়ে বিরোধী অবস্থানে রয়েছে। অপরদিকে আওয়ামী লীগ ও অনন্য দলগুলি পুনরায় রাজনীতিতে ঢোকার চেষ্টা করছে। দেশে যাতে নির্বাচন না হয় সে অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে মুখোমুখি। পারস্পরিক অবিশ্বাস ও বিরোধের এই অবস্থা সাধারণ মানুষকে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সহিংসতার ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর মধ্যেই ক্ষমতাসীন অন্তবর্তীন সরকারে থাকা উপদেষ্টা তাদের রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চেষ্টা করছে এমন অভিযোগ
উঠেছে। অন্যদিকে বিরোধী দলের আন্দোলনও ধীরে ধীরে সংঘাতের রূপ নিচ্ছে। রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে দেশজুড়ে সহিংসতা বিস্তার ক্রমেই বেড়ে চলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগের ঘোষিত লকডাউন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সারা দেশে সহিংসতা, নাশকতা ও ভাঙচুরের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে গেছে। কমপক্ষে তারা ২০ টি গাড়িতে াাগুন দিয়েছে। এসব ঘটনায় অনেকে হতাহত হয়েছে। দগ্ধ হয়ে
মারাও গেছে। ঢাকার ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকার কথা থাকলেও কর্মসূচির প্রভাব
ছড়িয়ে পড়েছে পুরো দেশজুড়ে। রাজধানীর বহু জায়গায় আগুন দিয়ে বাস, দোকান, ছোটখাটো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। আওয়ামীলীগের আগুন সন্ত্রাস দেখে জনসাধার ভীত হয়ে পড়েছে। পুলিশ বলছে,অন্তত ২০টি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি স্থানে রেললাইন পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ঢাকা–খুলনা মহাসড়কে একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন ধরিয়ে
দেওয়ার ঘটনায় একজন দগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন, যা দেশের পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। পুলিশের দাবি—এই নাশকতার সঙ্গে আওয়ামী লীগেরই কিছু
কর্মী জড়িত। এদিকে, দেশের বিভিন্ন জায়গায় অবরোধ, মহাসড়ক বন্ধ করে রাখা, যানবাহনে হামলা, দোকানপাট ভাঙচুর—এসব কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চরম বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য,
সাধারণ মানুষের যাতায়াত—সব ক্ষেত্রেই অস্থিরতা প্রকট। দেশের অর্থনীতিও এর
ফলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছে। এদিকে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন—সহিংসতা রোধে সরকার পারবে কি সফলতা অর্জন করতে এ প্রশ্ন সর্ব সাধারনের মধ্যে ঘুর পাক খাচ্ছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু এর আগে দেশে যে ধরনের সহিংসতা ও রাজনৈতিক উত্তেজনা চলছে, তাতে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে—সরকার কি আদৌ সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করে একটি শান্তিপূর্ণ
ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে? নির্বাচনের আগে থেকেই যদি অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে ভোটের দিনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়। এছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর আজকের বর্জন-হুমকি বা শক্ত অবস্থান আগামী নির্বাচনের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে পারে। একটি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ ও জনগণের আস্থার ওপর।
কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণ সেই আস্থাকে ক্রমেই দুর্বল করছে। আমার মতে সমঝোতা ও সংলাপ—এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ। কিন্ত সেটা কি ভাবে হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে কোনো দলই সংঘাত, সহিংসতা বা ক্ষমতার গণনা করে প্রকৃত সমাধানে পৌঁছাতে পারবে না। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সকল দলের উচিত হবে সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতার পথ খোঁজা। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও সহিংসতার রাজনীতি কেবল
দেশের স্থিতিশীলতাকেই নয়, অর্থনীতি, প্রশাসন এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে
বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একসময় যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমাদের গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে ভাবা হয়েছিল, আজ তা উল্টো দেশকে গভীর অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে গেলে দলগুলোর মধ্যে আস্থা ফেরানোই প্রধান শর্ত। সহিংসতা কোনো সমস্যার সমাধান নয়—বরং তা নতুন সমস্যা সৃষ্টি করে। দেশের জনগণ শান্তি, নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা চায়; তাই রাজনৈতিক নেতাদেরও সেই দায়িত্ববোধ
নিয়ে এগিয়ে আসা জরুরি।
লেখক ও গবেষক
আওরঙ্গজেব কামাল
সভাপতি
আন্তর্জাতিক প্রেস ক্লাব
ঢাকা প্রেস ক্লাব
Leave a Reply