
আমি মনে করি—গীত, বাদ্য ও নৃত্য এই তিনটির সমন্বয়ে যে ক্রিয়া সৃষ্টি হয়, সেটিই হল সংগীত। সংগীতের সুমধুর সৌন্দর্য্য শ্রতিরস তথা সুরের অনুপম কৌশলে মানুষের হৃদয়ের প্রেম, ভক্তি, বিরহ, আশা, নিরাশা, আনন্দ ও বেদনাকে প্রশমিত করে। এটি অন্তরকে সুপ্রসন্ন, নির্মল ও কলুষমুক্ত করে এবং ব্যক্তির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যকে সঠিক পথে পরিচালিত করার ক্ষমতা রাখে। এ কারণেই সংগীতকে সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্যা বলা হয়ে থাকে। সুতরাং আমাদের বাল্যকাল থেকেই সংগীত শিক্ষার্জন করা একান্তই প্রয়োজনীয়।
সংগীত মানব সমাজে কিভাবে বিস্তার লাভ করেছে তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে অনেকের মতে, গুণী, ঋষি, আওলিয়া ও দরবেশদের মাধ্যমে সংগীতের উৎপত্তি ঘটেছে। অন্য কেউ মনে করেন, প্রাচীন আর্য্যজাতিরা দেব-দেবীর আরাধনা বা পূজার্চনার সময় বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করত। এভাবেই সংগীতের উদ্ভব ঘটেছে।
মানুষ যখন জীবন শুরু করে, তখন ধীরে ধীরে সভ্যতার আলোক স্পর্শে আসে। একে অপরের ভাবের আদান-প্রদানের জন্য আবেগপ্রবণ সুরের প্রয়োজন হয়। সেই সুরই পরবর্তীতে সংগীতে রূপান্তরিত হয়। সংগীত থেকেই বিভিন্ন রাগের জন্ম—যেমন, রাগ সংগীত। উপমহাদেশের রাগ সংগীত এককভাবে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ধ্রুপদ, ধামার, টপ্পা, ঠুমরী, গজল, কাওয়ালী ইত্যাদি একাধিক রূপে প্রকাশিত হয়।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রাগ সংগীতজ্ঞরা তাদের অক্লান্ত সাধনায় রাগ সংগীতকে প্রাচীন পর্ণকুঠির থেকে রাজদরবার পর্যন্ত উন্নীত করেছেন। বিশেষভাবে তানসেন যখন মিঞা কিমল্লার রাগের সুর তুলতেন, সম্রাট আকবর সেই সুর গভীরভাবে শুনতেন। খেয়াল সংগীতের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত আলাউদ্দীন খিলজীর সভাগায়ক হযরত আমীর খসরু। পরে নিয়ামত আলী খাঁ খেয়াল সংগীতের পূর্ণাঙ্গ রূপ দেন। মোঘল সম্রাট মুহম্মদ শাহের দরবারে বীণার সদারঙ্গ ও অদারঙ্গ ব্যবহার করে খেয়াল সংগীত বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিল।
সংগীত চর্চার জন্য বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে—বীণা, সেতার, এসরাজ, বেহালা, তানপুরা ইত্যাদি। আগে হারমোনিয়াম ছিল না; কেবল এই যন্ত্রগুলোর মাধ্যমে সংগীত শিক্ষা নেওয়া যেত। মানুষের চেষ্টায় ১৮৪০ সালে জার্মানির ডি বেইন হারমোনিয়াম আবিষ্কার করেন। বাংলায় এটি “সুরলালিত্য” নামে পরিচিত। হারমোনিয়ামের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সুর নির্ভুলভাবে পাওয়া যায়, যা গান গাওয়া বা শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেয়।
বর্তমান যুগে হারমোনিয়ামের পাশাপাশি গীটার, প্যাড, ড্রাম, কী-বোর্ড, তবলাদুগি, নাল, খোল, বাঁশী ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র ছাড়া সংগীত চর্চা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
লেখক:
মোঃ মোস্তফা কামাল চৌধুরী (জিন্নাহ)
সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক (কেন্দ্র কমিটি)
বাংলাদেশ সেন্ট্রাল প্রেসক্লাব
Leave a Reply