ঢাকা ০৩:৩৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সম্পদ চাই না, চাই শুধু পিতার পরিচয়: জন্মদাতার স্বীকৃতি পেতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন অসহায় লিয়ার

  • Reporter Name
  • Update Time : ১২:২৯:৪৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
  • ৩১ Time View
Print

খন্দকার জলিল, জেলা প্রধান, পটুয়াখালী:

​রক্তের বাঁধন যেখানে আজন্ম অটুট থাকার কথা, সেখানে এক নিষ্ঠুর বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আকাশপানে চেয়ে আছেন এক তরুণ। পিতার হাত ধরে পৃথিবীর আলো দেখা সন্তান আজ পিতার কাছেই এক অনাকাঙ্ক্ষিত আগন্তুক। রক্তের সম্পর্কের চেয়েও আজ বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে সামাজিক দাপট আর সংসারকেন্দ্রিক স্বার্থপরতা।

পিতৃপরিচয়হীনতার এই অসহ্য যন্ত্রণায় যে তরুণ প্রতিদিন তিলে তিলে মরছেন, তার চোখের জল যেন আজ বিচার চাইছে সমাজের কাছে, বিবেকের কাছে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত জীবনটা তবু সহ্য করা যায়, কিন্তু নিজের জন্মদাতা পিতা যখন সন্তানকে অস্বীকার করেন, সেই দহনের চেয়ে বড় যাতনা পৃথিবীতে আর কী হতে পারে?

​পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার ডাকুয়া ইউনিয়নের ছোট চত্রা গ্রামের বাসিন্দা আনছার রাড়ী। প্রায় ৩৫ বছর আগে দশমিনা উপজেলার রনগোপালদী ইউনিয়নের মৃত মুজাফফর হাওলাদারের কন্যা হালিমা বেগমকে বিয়ে করেন। বিয়ের দুই বছর পর তাদের সংসারে আসে এক পুত্র সন্তান, নাম রাখা হয় মো. লিয়ার হোসেন। কিন্তু দাম্পত্য জীবনের সেই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার কলহের জেরে বিয়ের ১০ বছর পর হালিমা বেগমকে তালাক দেন আনছার রাড়ী।

কোনো উপায়ান্তর না দেখে হালিমা বেগম তার শিশুপুত্রকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন। পরিস্থিতির নির্মম পরিহাসে এর পাঁচ বছর পর হালিমা বেগম পুনরায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং সন্তানকে রেখে নতুন জীবনে চলে যান।

​মায়ের আশ্রয় হারানোর পর লিয়ার হোসেন আশ্রয় খুঁজেছিল তার জন্মদাতা পিতার কাছে। কিন্তু সেখানে গিয়ে সে সম্মুখীন হয় নতুন এক বিপত্তির। বাবার বাড়িতে সৎ মায়ের নিষ্ঠুরতায় ঠাঁই মেলেনি অনাথ এই শিশুর। এরপর থেকে শুরু হয় লিয়ারের জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়।

সামান্য একটু মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের আশায় সে পাড়ি জমায় ঢাকা শহরে। সেখানে কঠিন জীবনসংগ্রাম, যেখানে যা পেয়েছে তাই করেছে, মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে কোনোমতে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে গেছে। সংসার জীবনে প্রয়োজনে নিজেও বিয়ে করেছে, কিন্তু মনের ভেতর সব সময় বয়ে বেড়িয়েছে জন্মদাতা পিতাকে ফিরে পাওয়ার এক তীব্র আকুলতা।

​শেষ পর্যন্ত সমস্ত আশা নিয়ে লিয়ার ফিরে এসেছে তার বাবার গ্রামে, নিজের বসতভিটায়। কিন্তু সেই একই চিত্র—সৎ মায়ের দাপটে আবারও উপেক্ষিত হয়েছে সে। চরম নিষ্ঠুরতায় জন্মদাতা পিতা আনছার রাড়ী আজ লিয়ারকে তার সন্তান হিসেবে স্বীকার করতেই অস্বীকার করছেন। অথচ তার জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তে স্পষ্টাক্ষরে লেখা রয়েছে: নাম- মো. লিয়ার হোসেন, পিতা- মো. আনছার আলী, মাতা- মোসা: হালিমা বেগম, জন্ম তারিখ- ০১ জানুয়ারি ১৯৯২ ইং, পরিচয়পত্র নম্বর- ৪২০২৫৫১৯৫০.

নথিপত্র যেখানে সত্যের সাক্ষ্য দিচ্ছে, সেখানে নিজের সন্তানকে অস্বীকার করার মতো নির্মমতা সমাজ কীভাবে দেখছে?

​সংবাদ সম্মেলনে কান্নায় ভেঙে পড়ে লিয়ার বলেন, ‘আমি আমার পিতার সম্পদ চাই না, আমি শুধু আমার পিতার স্বীকৃতি নিয়ে বাঁচতে চাই। পিতার নাম ছাড়া আমি সমাজের মানুষের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি না। সরকারি কোনো কাজে, অফিস-আদালতে বা যেকোনো প্রয়োজনে যখন পিতার নাম লিখতে হয়, তখন আমি কী লিখব? জন্মদাতা পিতা আমাকে পরিচয় না দেওয়ায় আমি আজ চরম অস্তিত্বের সংকটে ভুগছি। আমি কি বেঁচে থাকার অধিকার রাখি না?’

​একজন সন্তানের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল তার বাবা। সেই বাবার স্বীকৃতি না পাওয়ার বেদনা কোনো আইন বা দলিলে মেটানো সম্ভব নয়। লিয়ারের এই কান্না কি পৌঁছাবে সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্ণকুহরে? একটি ছেলের আর্তনাদ কি পারবে পাথরসম হৃদয়ের অধিকারী পিতাকে গলিয়ে দিতে? এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা, দেখা যাক এই হতভাগা সন্তানের পিতৃপরিচয় পাওয়ার লড়াই কোথায় গিয়ে শেষ হয়।

Tag :
About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

জাহিদ ইকবাল জাহাঙ্গীরের কলমে ‘মতলবী’—সমাজবাস্তবতার অনন্য কাব্যচিত্র

সম্পদ চাই না, চাই শুধু পিতার পরিচয়: জন্মদাতার স্বীকৃতি পেতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন অসহায় লিয়ার

Update Time : ১২:২৯:৪৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
Print

খন্দকার জলিল, জেলা প্রধান, পটুয়াখালী:

​রক্তের বাঁধন যেখানে আজন্ম অটুট থাকার কথা, সেখানে এক নিষ্ঠুর বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আকাশপানে চেয়ে আছেন এক তরুণ। পিতার হাত ধরে পৃথিবীর আলো দেখা সন্তান আজ পিতার কাছেই এক অনাকাঙ্ক্ষিত আগন্তুক। রক্তের সম্পর্কের চেয়েও আজ বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে সামাজিক দাপট আর সংসারকেন্দ্রিক স্বার্থপরতা।

পিতৃপরিচয়হীনতার এই অসহ্য যন্ত্রণায় যে তরুণ প্রতিদিন তিলে তিলে মরছেন, তার চোখের জল যেন আজ বিচার চাইছে সমাজের কাছে, বিবেকের কাছে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত জীবনটা তবু সহ্য করা যায়, কিন্তু নিজের জন্মদাতা পিতা যখন সন্তানকে অস্বীকার করেন, সেই দহনের চেয়ে বড় যাতনা পৃথিবীতে আর কী হতে পারে?

​পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার ডাকুয়া ইউনিয়নের ছোট চত্রা গ্রামের বাসিন্দা আনছার রাড়ী। প্রায় ৩৫ বছর আগে দশমিনা উপজেলার রনগোপালদী ইউনিয়নের মৃত মুজাফফর হাওলাদারের কন্যা হালিমা বেগমকে বিয়ে করেন। বিয়ের দুই বছর পর তাদের সংসারে আসে এক পুত্র সন্তান, নাম রাখা হয় মো. লিয়ার হোসেন। কিন্তু দাম্পত্য জীবনের সেই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার কলহের জেরে বিয়ের ১০ বছর পর হালিমা বেগমকে তালাক দেন আনছার রাড়ী।

কোনো উপায়ান্তর না দেখে হালিমা বেগম তার শিশুপুত্রকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন। পরিস্থিতির নির্মম পরিহাসে এর পাঁচ বছর পর হালিমা বেগম পুনরায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং সন্তানকে রেখে নতুন জীবনে চলে যান।

​মায়ের আশ্রয় হারানোর পর লিয়ার হোসেন আশ্রয় খুঁজেছিল তার জন্মদাতা পিতার কাছে। কিন্তু সেখানে গিয়ে সে সম্মুখীন হয় নতুন এক বিপত্তির। বাবার বাড়িতে সৎ মায়ের নিষ্ঠুরতায় ঠাঁই মেলেনি অনাথ এই শিশুর। এরপর থেকে শুরু হয় লিয়ারের জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়।

সামান্য একটু মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের আশায় সে পাড়ি জমায় ঢাকা শহরে। সেখানে কঠিন জীবনসংগ্রাম, যেখানে যা পেয়েছে তাই করেছে, মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে কোনোমতে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে গেছে। সংসার জীবনে প্রয়োজনে নিজেও বিয়ে করেছে, কিন্তু মনের ভেতর সব সময় বয়ে বেড়িয়েছে জন্মদাতা পিতাকে ফিরে পাওয়ার এক তীব্র আকুলতা।

​শেষ পর্যন্ত সমস্ত আশা নিয়ে লিয়ার ফিরে এসেছে তার বাবার গ্রামে, নিজের বসতভিটায়। কিন্তু সেই একই চিত্র—সৎ মায়ের দাপটে আবারও উপেক্ষিত হয়েছে সে। চরম নিষ্ঠুরতায় জন্মদাতা পিতা আনছার রাড়ী আজ লিয়ারকে তার সন্তান হিসেবে স্বীকার করতেই অস্বীকার করছেন। অথচ তার জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তে স্পষ্টাক্ষরে লেখা রয়েছে: নাম- মো. লিয়ার হোসেন, পিতা- মো. আনছার আলী, মাতা- মোসা: হালিমা বেগম, জন্ম তারিখ- ০১ জানুয়ারি ১৯৯২ ইং, পরিচয়পত্র নম্বর- ৪২০২৫৫১৯৫০.

নথিপত্র যেখানে সত্যের সাক্ষ্য দিচ্ছে, সেখানে নিজের সন্তানকে অস্বীকার করার মতো নির্মমতা সমাজ কীভাবে দেখছে?

​সংবাদ সম্মেলনে কান্নায় ভেঙে পড়ে লিয়ার বলেন, ‘আমি আমার পিতার সম্পদ চাই না, আমি শুধু আমার পিতার স্বীকৃতি নিয়ে বাঁচতে চাই। পিতার নাম ছাড়া আমি সমাজের মানুষের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি না। সরকারি কোনো কাজে, অফিস-আদালতে বা যেকোনো প্রয়োজনে যখন পিতার নাম লিখতে হয়, তখন আমি কী লিখব? জন্মদাতা পিতা আমাকে পরিচয় না দেওয়ায় আমি আজ চরম অস্তিত্বের সংকটে ভুগছি। আমি কি বেঁচে থাকার অধিকার রাখি না?’

​একজন সন্তানের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল তার বাবা। সেই বাবার স্বীকৃতি না পাওয়ার বেদনা কোনো আইন বা দলিলে মেটানো সম্ভব নয়। লিয়ারের এই কান্না কি পৌঁছাবে সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্ণকুহরে? একটি ছেলের আর্তনাদ কি পারবে পাথরসম হৃদয়ের অধিকারী পিতাকে গলিয়ে দিতে? এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা, দেখা যাক এই হতভাগা সন্তানের পিতৃপরিচয় পাওয়ার লড়াই কোথায় গিয়ে শেষ হয়।