ঢাকা ০৩:৩০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আলোচনা সমালোচনা, নিন্দা আর অসুস্থতাকে জয় করে মানুষের অধিকারের লড়াইয়ে অদম্য শারমিন আরা

  • Reporter Name
  • Update Time : ১২:২৪:৪৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
  • ৩০ Time View
Print

মোঃ মিল্টন হোসেন,বিশেষ প্রতিনিধি ঝিনাইদহ:

আমি তার সম্পর্কে লিখেছি, অনেকেই মনে করবেন এটি চামচামি করা, কিন্তু না।
সমাজের জন্য কাজ করা মানুষদের জীবন সবসময় সহজ হয় না। মানুষের সুখ-দুঃখের কথা তুলে ধরা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরা কিংবা নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পথ কখনোই মসৃণ নয়। সেই পথে হাঁটতে গিয়ে অনেক সময় প্রশংসার চেয়ে সমালোচনাই বেশি শুনতে হয়। তবুও কিছু মানুষ থেমে যান না। সকল বাধা-বিপত্তি, কটূক্তি এবং ব্যক্তিগত কষ্টকে উপেক্ষা করে তারা মানুষের জন্য কাজ করে যান। ঝিনাইদহের সাংবাদিক শারমিন আরা এমনই একজন মানুষ, যিনি বছরের পর বছর ধরে মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নিজেকে নিবেদিত রেখেছেন।
নারী ও শিশু অধিকার রক্ষা, নির্যাতিত মানুষের কথা তুলে ধরা, সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং প্রান্তিক মানুষের সমস্যাকে গণমাধ্যমের মাধ্যমে সামনে আনার ক্ষেত্রে শারমিন আরার ভূমিকা দীর্ঘদিনের। সাংবাদিকতার মাধ্যমে তিনি শুধু সংবাদ পরিবেশন করেননি, বরং অসংখ্য মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন।
কিন্তু এই পথচলায় তিনি সবসময় প্রশংসা পাননি। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তাকে বহুবার সমালোচনা, কটূক্তি এবং নিন্দার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কোনো সংবাদ প্রকাশের পর অনেকেই তথ্য যাচাই না করেই ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছেন। কেউ কেউ তার কাজের ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন, আবার কেউ তার সততা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। অথচ যাদের জন্য তিনি কাজ করেছেন, তাদের অনেকেই জানেন একজন সাংবাদিক হিসেবে মানুষের অধিকার আদায়ে তার নিরলস পরিশ্রমের কথা।
একজন নারী সাংবাদিক হিসেবে তার সংগ্রাম ছিল আরও কঠিন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সাংবাদিকতা পেশায় নারীদের প্রতিনিয়ত নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। মাঠে কাজ করার সময় যেমন ঝুঁকি থাকে, তেমনি সামাজিকভাবে নানা ধরনের নেতিবাচক মন্তব্যও সহ্য করতে হয়। শারমিন আরাও এর ব্যতিক্রম নন। সংবাদ সংগ্রহের জন্য দিনের পর দিন ছুটে বেড়ানো, মানুষের অভিযোগ শোনা, প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং সত্য তথ্য প্রকাশের চেষ্টা করতে গিয়ে তাকে বহু প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।
তবুও তিনি থেমে থাকেননি। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, সাংবাদিকতার মূল শক্তি হলো সত্য এবং মানুষের আস্থা। একজন সাংবাদিকের কাজ শুধু ঘটনা জানানো নয়, বরং সমাজের অবহেলিত মানুষের কথা তুলে ধরা। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি কাজ করে যাচ্ছেন বছরের পর বছর।
বর্তমানে শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি বাড়িতে অবস্থান করছেন। অনেকেই ভেবেছিলেন হয়তো তার কর্মযাত্রা কিছুদিনের জন্য থেমে যাবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি মানুষের খোঁজখবর নিচ্ছেন, বিভিন্ন ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করছেন এবং নিজের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় থেকেও মানুষের অধিকার রক্ষার প্রশ্নে তিনি কখনো আপস করেননি।
তার ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্য, অসুস্থতার এই সময়টিও তার জন্য সহজ নয়। শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি মানসিক চাপও রয়েছে। তবুও মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছাশক্তিই তাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। যখন অনেকেই সামান্য প্রতিবন্ধকতায় কাজ থেকে সরে দাঁড়ান, তখন শারমিন আরা অসুস্থ শরীর নিয়েও দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে নিজের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
নারী ও শিশু নির্যাতনের অসংখ্য ঘটনা তিনি গণমাধ্যমে তুলে ধরেছেন। অনেক নির্যাতিত নারী ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায় তার কাছে এসেছেন। অসহায় পরিবারের কান্না, নির্যাতিত শিশুর আর্তনাদ কিংবা সমাজের বঞ্চিত মানুষের দীর্ঘশ্বাস তাকে বারবার নাড়া দিয়েছে। আর সেই দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি তাদের কথা জনসম্মুখে তুলে ধরেছেন।
তার প্রকাশিত অনেক সংবাদ প্রশাসনের নজরে এসেছে, বিভিন্ন সমস্যার সমাধান হয়েছে এবং অনেক ভুক্তভোগী ন্যায়বিচারের আশা দেখতে পেয়েছেন। যদিও এসব কাজের স্বীকৃতি সবসময় তিনি পাননি। বরং অনেক ক্ষেত্রে তাকে ভুল বোঝা হয়েছে, সমালোচিত হতে হয়েছে এবং অকারণ আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে।
তবে ইতিহাস বলে, যারা মানুষের জন্য কাজ করেন, তাদের পথচলায় সমালোচনা নতুন কিছু নয়। সমাজ পরিবর্তনের প্রতিটি সংগ্রামে সমালোচনা ছিল, বিরোধিতা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষের কল্যাণে যারা নিবেদিত থাকেন, তারাই মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। শারমিন আরার জীবন ও কর্মও সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।
আজ যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে অপমান করা বা হেয় করা খুব সহজ হয়ে গেছে, তখন একজন নারী সাংবাদিক হিসেবে তিনি ধৈর্য, সাহস এবং পেশাদারিত্বের সঙ্গে নিজের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। সমালোচনা তাকে থামাতে পারেনি, অসুস্থতা তাকে হার মানাতে পারেনি, নিন্দা তাকে পথচ্যুত করতে পারেনি।
মানুষের অধিকারের প্রশ্নে, সত্যের পক্ষে এবং ন্যায়বিচারের দাবিতে তার এই সংগ্রাম নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। ঝিনাইদহের সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করে তিনি যে পথচলা শুরু করেছিলেন, সেই পথচলা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
সমালোচনা, নিন্দা, কষ্ট, অসুস্থতা—সবকিছুকে পেছনে ফেলে মানুষের অধিকারের পক্ষে যে কলম আজও সচল, সেই কলমের নাম শারমিন আরা। তার এই সাহসী ও মানবিক পথচলা আগামী প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

Tag :
About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

জাহিদ ইকবাল জাহাঙ্গীরের কলমে ‘মতলবী’—সমাজবাস্তবতার অনন্য কাব্যচিত্র

আলোচনা সমালোচনা, নিন্দা আর অসুস্থতাকে জয় করে মানুষের অধিকারের লড়াইয়ে অদম্য শারমিন আরা

Update Time : ১২:২৪:৪৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
Print

মোঃ মিল্টন হোসেন,বিশেষ প্রতিনিধি ঝিনাইদহ:

আমি তার সম্পর্কে লিখেছি, অনেকেই মনে করবেন এটি চামচামি করা, কিন্তু না।
সমাজের জন্য কাজ করা মানুষদের জীবন সবসময় সহজ হয় না। মানুষের সুখ-দুঃখের কথা তুলে ধরা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরা কিংবা নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পথ কখনোই মসৃণ নয়। সেই পথে হাঁটতে গিয়ে অনেক সময় প্রশংসার চেয়ে সমালোচনাই বেশি শুনতে হয়। তবুও কিছু মানুষ থেমে যান না। সকল বাধা-বিপত্তি, কটূক্তি এবং ব্যক্তিগত কষ্টকে উপেক্ষা করে তারা মানুষের জন্য কাজ করে যান। ঝিনাইদহের সাংবাদিক শারমিন আরা এমনই একজন মানুষ, যিনি বছরের পর বছর ধরে মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নিজেকে নিবেদিত রেখেছেন।
নারী ও শিশু অধিকার রক্ষা, নির্যাতিত মানুষের কথা তুলে ধরা, সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং প্রান্তিক মানুষের সমস্যাকে গণমাধ্যমের মাধ্যমে সামনে আনার ক্ষেত্রে শারমিন আরার ভূমিকা দীর্ঘদিনের। সাংবাদিকতার মাধ্যমে তিনি শুধু সংবাদ পরিবেশন করেননি, বরং অসংখ্য মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন।
কিন্তু এই পথচলায় তিনি সবসময় প্রশংসা পাননি। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তাকে বহুবার সমালোচনা, কটূক্তি এবং নিন্দার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কোনো সংবাদ প্রকাশের পর অনেকেই তথ্য যাচাই না করেই ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছেন। কেউ কেউ তার কাজের ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন, আবার কেউ তার সততা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। অথচ যাদের জন্য তিনি কাজ করেছেন, তাদের অনেকেই জানেন একজন সাংবাদিক হিসেবে মানুষের অধিকার আদায়ে তার নিরলস পরিশ্রমের কথা।
একজন নারী সাংবাদিক হিসেবে তার সংগ্রাম ছিল আরও কঠিন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সাংবাদিকতা পেশায় নারীদের প্রতিনিয়ত নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। মাঠে কাজ করার সময় যেমন ঝুঁকি থাকে, তেমনি সামাজিকভাবে নানা ধরনের নেতিবাচক মন্তব্যও সহ্য করতে হয়। শারমিন আরাও এর ব্যতিক্রম নন। সংবাদ সংগ্রহের জন্য দিনের পর দিন ছুটে বেড়ানো, মানুষের অভিযোগ শোনা, প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং সত্য তথ্য প্রকাশের চেষ্টা করতে গিয়ে তাকে বহু প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।
তবুও তিনি থেমে থাকেননি। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, সাংবাদিকতার মূল শক্তি হলো সত্য এবং মানুষের আস্থা। একজন সাংবাদিকের কাজ শুধু ঘটনা জানানো নয়, বরং সমাজের অবহেলিত মানুষের কথা তুলে ধরা। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি কাজ করে যাচ্ছেন বছরের পর বছর।
বর্তমানে শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি বাড়িতে অবস্থান করছেন। অনেকেই ভেবেছিলেন হয়তো তার কর্মযাত্রা কিছুদিনের জন্য থেমে যাবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি মানুষের খোঁজখবর নিচ্ছেন, বিভিন্ন ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করছেন এবং নিজের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় থেকেও মানুষের অধিকার রক্ষার প্রশ্নে তিনি কখনো আপস করেননি।
তার ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্য, অসুস্থতার এই সময়টিও তার জন্য সহজ নয়। শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি মানসিক চাপও রয়েছে। তবুও মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছাশক্তিই তাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। যখন অনেকেই সামান্য প্রতিবন্ধকতায় কাজ থেকে সরে দাঁড়ান, তখন শারমিন আরা অসুস্থ শরীর নিয়েও দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে নিজের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
নারী ও শিশু নির্যাতনের অসংখ্য ঘটনা তিনি গণমাধ্যমে তুলে ধরেছেন। অনেক নির্যাতিত নারী ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায় তার কাছে এসেছেন। অসহায় পরিবারের কান্না, নির্যাতিত শিশুর আর্তনাদ কিংবা সমাজের বঞ্চিত মানুষের দীর্ঘশ্বাস তাকে বারবার নাড়া দিয়েছে। আর সেই দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি তাদের কথা জনসম্মুখে তুলে ধরেছেন।
তার প্রকাশিত অনেক সংবাদ প্রশাসনের নজরে এসেছে, বিভিন্ন সমস্যার সমাধান হয়েছে এবং অনেক ভুক্তভোগী ন্যায়বিচারের আশা দেখতে পেয়েছেন। যদিও এসব কাজের স্বীকৃতি সবসময় তিনি পাননি। বরং অনেক ক্ষেত্রে তাকে ভুল বোঝা হয়েছে, সমালোচিত হতে হয়েছে এবং অকারণ আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে।
তবে ইতিহাস বলে, যারা মানুষের জন্য কাজ করেন, তাদের পথচলায় সমালোচনা নতুন কিছু নয়। সমাজ পরিবর্তনের প্রতিটি সংগ্রামে সমালোচনা ছিল, বিরোধিতা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষের কল্যাণে যারা নিবেদিত থাকেন, তারাই মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। শারমিন আরার জীবন ও কর্মও সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।
আজ যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে অপমান করা বা হেয় করা খুব সহজ হয়ে গেছে, তখন একজন নারী সাংবাদিক হিসেবে তিনি ধৈর্য, সাহস এবং পেশাদারিত্বের সঙ্গে নিজের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। সমালোচনা তাকে থামাতে পারেনি, অসুস্থতা তাকে হার মানাতে পারেনি, নিন্দা তাকে পথচ্যুত করতে পারেনি।
মানুষের অধিকারের প্রশ্নে, সত্যের পক্ষে এবং ন্যায়বিচারের দাবিতে তার এই সংগ্রাম নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। ঝিনাইদহের সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করে তিনি যে পথচলা শুরু করেছিলেন, সেই পথচলা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
সমালোচনা, নিন্দা, কষ্ট, অসুস্থতা—সবকিছুকে পেছনে ফেলে মানুষের অধিকারের পক্ষে যে কলম আজও সচল, সেই কলমের নাম শারমিন আরা। তার এই সাহসী ও মানবিক পথচলা আগামী প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।