ঢাকা ০৩:৩০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০১ অগাস্ট ২০২৬, ১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গড়াই নদীর ভাঙনে ঘোড়াইঘাটের ৫০ মিটার পাড় বিলীন ভিটে মাটি হারানোর শঙ্কায় নদীতীরের বাসিন্দারা

  • Reporter Name
  • Update Time : ১২:০৫:১৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬
  • ১৪ Time View
Print

মোঃ জহুরুল ইসলাম, কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধিঃ

কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নের ঘোড়াইঘাট এলাকায় গড়াই নদীর তীরে হঠাৎ ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। বুধবার বিকেল থেকে শুরু হওয়া এই ভাঙনে ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ মিটার নদীতীর ধসে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে নদীপাড়ের শতাধিক পরিবারের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড ইতোমধ্যে জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধে প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে। তবে বাসিন্দারা স্থায়ী সমাধানের জোর দাবি জানিয়েছেন। স্থানীয় সূত্র ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার হঠাৎ করে কুষ্টিয়া শহরের বড় বাজারের বিপরীতে ঘোড়াইঘাট এলাকায় গড়াই নদের পাড়ে ভাঙন শুরু হয়। চলতি মাসের ২৬ তারিখ থেকেই এলাকায় ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। সম্প্রতি অধিক বৃষ্টিপাতের কারণে উজান থেকে প্রচুর পানি নেমে আসায় গড়াই ও পদ্মা নদীর পানি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাবে নদীতীর দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে এবং একের পর এক মাটির চাঁই নদীতে ধসে পড়ছে। স্থানীয়রা বলছেন, ভাঙনের শব্দ শুনে রাতে ঘুম হারাম হয়ে গেছে অনেকের। ঘোড়াইঘাট এলাকার এক নারী বাসিন্দা কাঁদো কাঁদো গলায় বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। এই নদীতীরেই বসবাস করি। বাইরে জায়গা কেনার মতো সামর্থ্য নেই। এই জায়গা ভভেঙে ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হলে আমরা কোথায় যাবো? ব্লক দিয়ে নদীর পাড় বেঁধে দিলে নিরাপদে থাকতে পারবো। আমাদের সারাজীবনের সঞ্চয় এই ঘরবাড়িতে। এখন সব হারানোর ভয়।” আরেক নারী জানান, “রাতের বেলায় ভাঙনের শব্দে ছোট ছোট বাচ্চারা ঘুমাতে পারেনি। অনেক কান্নাকাটি করেছে। আমাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে গেলে নতুন করে ঘরবাড়ি করার সামর্থ্য নেই। সরকার যদি এখনই স্থায়ী ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে আমরা পথে বসব।” স্থানীয় আরেক বাসিন্দা বলেন, “জুন ২৬ তারিখ থেকে ভাঙন শুরু হয়েছে। এখন জিওব্যাগ ফেলছে। আশা করছি এতেই রক্ষা পাবো। কিন্তু আমরা স্থায়ী সমাধান চাই। শুধু জিওব্যাগ দিয়ে কতদিন টিকবে ?”
কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুর রহমান জানান, “সম্প্রতি অধিক বৃষ্টিপাতে উজান থেকে পানি নেমে আসায় গড়াই ও পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থান হিসেবে ২৮টি পয়েন্ট চিহ্নিত করেছি। মারাত্মকভাবে ভাঙা স্থানে জিওব্যাগ ও টিউব ফেলে ভাঙন রোধের ব্যবস্থা নিচ্ছি। ঘোড়াইঘাট এলাকায়ও জিওব্যাগ ফেলে চেষ্টা চালাচ্ছি।” তিনি আরও বলেন, জরুরি ভিত্তিতে কাজ চলছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। বোর্ডের কর্মীরা দিন-রাত কাজ করছেন যাতে ভাঙন আরও না বাড়ে। নদীপাড়ের মানুষ অবিলম্বে ভাঙন প্রতিরোধে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, শুধু জিওব্যাগ দিয়ে সাময়িক সমাধান হলেও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য ব্লক বা অন্যান্য স্থায়ী কাঠামো নির্মাণ করা প্রয়োজন। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, ভাঙন যদি আরও এগোয় তাহলে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও রাস্তাঘাট হারাতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওপর তাদের আস্থা রয়েছে, তবে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ চাইছেন তারা। কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, “আমরা প্রতিবছর এই ভাঙনের শিকার হই। এবার যেন শেষবারের মতো স্থায়ী সমাধান হয়।” এই ভাঙনের ফলে এলাকার সামগ্রিক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। নদীপাড়ের মানুষ রাত জেগে নদী পর্যবেক্ষণ করছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা নিয়মিত পরিদর্শন করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয়রা আশা করছেন, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে ভাঙন থেমে যাবে এবং তাদের বসতবাড়ি রক্ষা পাবে। একইসঙ্গে তারা স্থায়ী সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। কুমারখালীর এই অঞ্চলে নদীভাঙন নতুন কিছু নয়, তবে এবারের হঠাৎ ধস স্থানীয়দের আরও বেশি উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

Tag :
About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

শিশুর কোলে শিশু: আমরা কি শুধু অবাক হব, নাকি রাষ্ট্রও জবাব দেবে?

গড়াই নদীর ভাঙনে ঘোড়াইঘাটের ৫০ মিটার পাড় বিলীন ভিটে মাটি হারানোর শঙ্কায় নদীতীরের বাসিন্দারা

Update Time : ১২:০৫:১৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬
Print

মোঃ জহুরুল ইসলাম, কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধিঃ

কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নের ঘোড়াইঘাট এলাকায় গড়াই নদীর তীরে হঠাৎ ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। বুধবার বিকেল থেকে শুরু হওয়া এই ভাঙনে ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ মিটার নদীতীর ধসে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে নদীপাড়ের শতাধিক পরিবারের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড ইতোমধ্যে জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধে প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে। তবে বাসিন্দারা স্থায়ী সমাধানের জোর দাবি জানিয়েছেন। স্থানীয় সূত্র ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার হঠাৎ করে কুষ্টিয়া শহরের বড় বাজারের বিপরীতে ঘোড়াইঘাট এলাকায় গড়াই নদের পাড়ে ভাঙন শুরু হয়। চলতি মাসের ২৬ তারিখ থেকেই এলাকায় ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। সম্প্রতি অধিক বৃষ্টিপাতের কারণে উজান থেকে প্রচুর পানি নেমে আসায় গড়াই ও পদ্মা নদীর পানি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাবে নদীতীর দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে এবং একের পর এক মাটির চাঁই নদীতে ধসে পড়ছে। স্থানীয়রা বলছেন, ভাঙনের শব্দ শুনে রাতে ঘুম হারাম হয়ে গেছে অনেকের। ঘোড়াইঘাট এলাকার এক নারী বাসিন্দা কাঁদো কাঁদো গলায় বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। এই নদীতীরেই বসবাস করি। বাইরে জায়গা কেনার মতো সামর্থ্য নেই। এই জায়গা ভভেঙে ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হলে আমরা কোথায় যাবো? ব্লক দিয়ে নদীর পাড় বেঁধে দিলে নিরাপদে থাকতে পারবো। আমাদের সারাজীবনের সঞ্চয় এই ঘরবাড়িতে। এখন সব হারানোর ভয়।” আরেক নারী জানান, “রাতের বেলায় ভাঙনের শব্দে ছোট ছোট বাচ্চারা ঘুমাতে পারেনি। অনেক কান্নাকাটি করেছে। আমাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে গেলে নতুন করে ঘরবাড়ি করার সামর্থ্য নেই। সরকার যদি এখনই স্থায়ী ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে আমরা পথে বসব।” স্থানীয় আরেক বাসিন্দা বলেন, “জুন ২৬ তারিখ থেকে ভাঙন শুরু হয়েছে। এখন জিওব্যাগ ফেলছে। আশা করছি এতেই রক্ষা পাবো। কিন্তু আমরা স্থায়ী সমাধান চাই। শুধু জিওব্যাগ দিয়ে কতদিন টিকবে ?”
কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুর রহমান জানান, “সম্প্রতি অধিক বৃষ্টিপাতে উজান থেকে পানি নেমে আসায় গড়াই ও পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থান হিসেবে ২৮টি পয়েন্ট চিহ্নিত করেছি। মারাত্মকভাবে ভাঙা স্থানে জিওব্যাগ ও টিউব ফেলে ভাঙন রোধের ব্যবস্থা নিচ্ছি। ঘোড়াইঘাট এলাকায়ও জিওব্যাগ ফেলে চেষ্টা চালাচ্ছি।” তিনি আরও বলেন, জরুরি ভিত্তিতে কাজ চলছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। বোর্ডের কর্মীরা দিন-রাত কাজ করছেন যাতে ভাঙন আরও না বাড়ে। নদীপাড়ের মানুষ অবিলম্বে ভাঙন প্রতিরোধে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, শুধু জিওব্যাগ দিয়ে সাময়িক সমাধান হলেও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য ব্লক বা অন্যান্য স্থায়ী কাঠামো নির্মাণ করা প্রয়োজন। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, ভাঙন যদি আরও এগোয় তাহলে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও রাস্তাঘাট হারাতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওপর তাদের আস্থা রয়েছে, তবে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ চাইছেন তারা। কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, “আমরা প্রতিবছর এই ভাঙনের শিকার হই। এবার যেন শেষবারের মতো স্থায়ী সমাধান হয়।” এই ভাঙনের ফলে এলাকার সামগ্রিক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। নদীপাড়ের মানুষ রাত জেগে নদী পর্যবেক্ষণ করছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা নিয়মিত পরিদর্শন করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয়রা আশা করছেন, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে ভাঙন থেমে যাবে এবং তাদের বসতবাড়ি রক্ষা পাবে। একইসঙ্গে তারা স্থায়ী সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। কুমারখালীর এই অঞ্চলে নদীভাঙন নতুন কিছু নয়, তবে এবারের হঠাৎ ধস স্থানীয়দের আরও বেশি উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।