ঢাকা ০৫:৩৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইয়াবার ধোঁয়ায় পুড়ছে টাকার নোট, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সমাজও

  • Reporter Name
  • Update Time : ১১:৫৫:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
  • ১৩ Time View
Print

একটি একশ টাকার নোট। নতুন, ঝকঝকে। হাতবদল হতে হতে সেটি পৌঁছেছিল এক সিগারেট বিক্রেতার কাছে। কিন্তু নোটটি হাতে নিয়ে তিনি বিস্মিত হন। নোটের একাংশ আগুনে পোড়া। প্রথমে হয়তো মনে হয়েছিল অসাবধানতাবশত এমনটি ঘটেছে। পরে জানা গেল, নোটটি ইয়াবা সেবনের সময় ব্যবহৃত হয়েছিল। ইয়াবার ধোঁয়া টানার জন্য সেটিকে নল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।

ঘটনাটি শুনতে তুচ্ছ মনে হতে পারে। একটি নোট পুড়েছে, তাতে এমন কী? কিন্তু একটু গভীরে তাকালে বোঝা যায়, এটি আসলে একটি রাষ্ট্র ও সমাজের নীরব সংকটের প্রতীক। কারণ আগুনে পোড়া সেই নোট শুধু একটি মুদ্রা নয়; সেটি আমাদের সময়ের এক নির্মম বাস্তবতার সাক্ষ্য। ইয়াবার ধোঁয়ায় পুড়ছে কেবল টাকার নোট নয়, পুড়ছে মানুষের জীবন, পরিবারের স্বপ্ন, সমাজের স্থিতি এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎও।

বাংলাদেশে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নতুন নয়। কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন ধরনের মাদক সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ইয়াবার বিস্তার ছিল তুলনামূলক দ্রুত এবং ভয়াবহ। একসময় সীমান্তবর্তী অঞ্চলের সমস্যা হিসেবে পরিচিত এই মাদক আজ দেশের প্রায় সর্বত্র পৌঁছে গেছে। রাজধানীর অভিজাত এলাকা থেকে শুরু করে গ্রামীণ জনপদ পর্যন্ত এর বিস্তার ঘটেছে। ফলে মাদক আর কোনো বিশেষ শ্রেণি বা অঞ্চলের সমস্যা নয়; এটি এখন জাতীয় সমস্যা।

ইয়াবার বিস্তারকে শুধু আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে। এর পেছনে রয়েছে বহুমাত্রিক সামাজিক বাস্তবতা। বেকারত্ব, হতাশা, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, মানসিক চাপ, সামাজিক অনিশ্চয়তা এবং দ্রুত সাফল্য অর্জনের সংস্কৃতি তরুণদের একাংশকে ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অনেক তরুণ প্রথমে কৌতূহলবশত বা বন্ধুর প্ররোচনায় মাদক গ্রহণ করে। পরে সেটিই নেশায় পরিণত হয়। একসময় সে বুঝতে পারে, মাদক আর তার নিয়ন্ত্রণে নেই; বরং সে নিজেই মাদকের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বহুবার সতর্ক করেছে, মাদকাসক্তি শুধু ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়; এটি একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি মাদকাসক্ত হলে তার ক্ষতি শুধু তার নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে পরিবার, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি এবং সামাজিক সম্পর্কের ওপর।

বাংলাদেশেও সেই বাস্তবতা স্পষ্ট। মাদকাসক্ত একজন তরুণ যখন ধীরে ধীরে পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি পরিবার। যখন সে কর্মক্ষমতা হারায়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় অর্থনীতি। যখন সে অপরাধের পথে জড়িয়ে পড়ে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমাজের নিরাপত্তা। অর্থাৎ একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তির পেছনে থাকে বহুস্তরীয় সামাজিক ক্ষতির গল্প।

ইয়াবা অর্থনীতির জন্যও এক নীরব রক্তক্ষরণ। মাদক কিনতে গিয়ে অসংখ্য পরিবার তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করছে। কেউ সঞ্চয় ভাঙছে, কেউ জমি বিক্রি করছে, কেউ ঋণের বোঝা কাঁধে নিচ্ছে। মাদকাসক্ত সন্তানের চিকিৎসা করাতে গিয়ে অনেক পরিবার আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। এই ক্ষতির কোনো সরকারি হিসাব নেই, কিন্তু বাস্তবতা সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে।

পোড়া টাকার নোটের ঘটনাটিও অর্থনীতির এই অদৃশ্য ক্ষতির প্রতীক। একটি রাষ্ট্রের মুদ্রা কেবল কাগজ নয়; এটি অর্থনৈতিক আস্থার প্রতীক। সেই মুদ্রাই যখন মাদক সেবনের সরঞ্জামে পরিণত হয়, তখন বিষয়টি শুধু একটি নোটের ক্ষতি নয়; এটি সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়েরও প্রতীক হয়ে ওঠে।

মাদক ও অপরাধের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই দেখা গেছে, মাদকাসক্তি এবং অপরাধ পরস্পরকে শক্তিশালী করে। ইয়াবা সেবনের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে অনেকে চুরি, ছিনতাই, প্রতারণা কিংবা সহিংস অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। আবার মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে শক্তিশালী অপরাধচক্র। ফলে মাদক শুধু স্বাস্থ্যগত সংকট নয়; এটি আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি।

তবে মাদক সমস্যার সবচেয়ে করুণ দিক সম্ভবত এর মানবিক মূল্য। একটি পরিবারের কাছে একজন সন্তানের মাদকাসক্ত হয়ে পড়া অনেক সময় মৃত্যুসংবাদের চেয়েও বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে। কারণ সে তখন বেঁচে থাকে, কিন্তু ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে। পরিবারের সদস্যরা প্রতিদিন তাকে চোখের সামনে ভেঙে পড়তে দেখেন। তাদের অসহায়ত্বের কোনো পরিসংখ্যান হয় না, কোনো শিরোনামও হয় না।

মাদকবিরোধী অভিযানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন নেই। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগের কার্যকরতা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু শুধু অভিযান দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। গত কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা অন্তত সে কথাই বলে।

প্রয়োজন প্রতিরোধমূলক সামাজিক ব্যবস্থা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বৃদ্ধি, তরুণদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং পরিবারভিত্তিক নজরদারি- এসব উদ্যোগ সমান গুরুত্বপূর্ণ। একজন তরুণ কেন মাদকের দিকে ঝুঁকছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। কারণ সমস্যার শিকড় অক্ষত রেখে শুধু ডালপালা ছাঁটলে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

সমাজ হিসেবেও আমাদের আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। আমরা কি তরুণদের জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছি, যেখানে তারা হতাশার বদলে আশার গল্প খুঁজে পাবে? আমরা কি পরিবারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিংবা সামাজিক পরিসরে তাদের জন্য পর্যাপ্ত মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করতে পেরেছি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে না পেলে মাদকবিরোধী লড়াই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

একটি পোড়া টাকার নোট তাই আমাদের কাছে কেবল একটি ক্ষতিগ্রস্ত মুদ্রা নয়। এটি এক ধরনের সতর্কবার্তা। এমন এক সতর্কবার্তা, যা আমাদের জানিয়ে দেয়- সমস্যা শুধু সীমান্তে নয়, শুধু কোনো অপরাধচক্রে নয়; সমস্যার শিকড় সমাজের ভেতরেও বিস্তৃত।

ইয়াবার ধোঁয়া যখন একটি টাকার নোটকে পুড়িয়ে দেয়, তখন সেই ধোঁয়া আসলে আমাদের সামাজিক বাস্তবতার ওপরও একটি কালো ছাপ ফেলে যায়। সেই ছাপ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব নয়; এটি পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং নাগরিক- সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।

নইলে হয়তো আগামী দিনে আরও অনেক পোড়া নোট আমাদের হাতে আসবে। কিন্তু তখন প্রশ্ন হবে, পুড়েছে কি শুধু নোট? নাকি ধীরে ধীরে পুড়ে গ

Tag :
About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

​গলাচিপায় বান্ধবীর বাসা থেকে তরুণীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার: মৃত্যুর আগে চলছিল ভিডিও রেকর্ড!

ইয়াবার ধোঁয়ায় পুড়ছে টাকার নোট, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সমাজও

Update Time : ১১:৫৫:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
Print

একটি একশ টাকার নোট। নতুন, ঝকঝকে। হাতবদল হতে হতে সেটি পৌঁছেছিল এক সিগারেট বিক্রেতার কাছে। কিন্তু নোটটি হাতে নিয়ে তিনি বিস্মিত হন। নোটের একাংশ আগুনে পোড়া। প্রথমে হয়তো মনে হয়েছিল অসাবধানতাবশত এমনটি ঘটেছে। পরে জানা গেল, নোটটি ইয়াবা সেবনের সময় ব্যবহৃত হয়েছিল। ইয়াবার ধোঁয়া টানার জন্য সেটিকে নল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।

ঘটনাটি শুনতে তুচ্ছ মনে হতে পারে। একটি নোট পুড়েছে, তাতে এমন কী? কিন্তু একটু গভীরে তাকালে বোঝা যায়, এটি আসলে একটি রাষ্ট্র ও সমাজের নীরব সংকটের প্রতীক। কারণ আগুনে পোড়া সেই নোট শুধু একটি মুদ্রা নয়; সেটি আমাদের সময়ের এক নির্মম বাস্তবতার সাক্ষ্য। ইয়াবার ধোঁয়ায় পুড়ছে কেবল টাকার নোট নয়, পুড়ছে মানুষের জীবন, পরিবারের স্বপ্ন, সমাজের স্থিতি এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎও।

বাংলাদেশে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নতুন নয়। কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন ধরনের মাদক সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ইয়াবার বিস্তার ছিল তুলনামূলক দ্রুত এবং ভয়াবহ। একসময় সীমান্তবর্তী অঞ্চলের সমস্যা হিসেবে পরিচিত এই মাদক আজ দেশের প্রায় সর্বত্র পৌঁছে গেছে। রাজধানীর অভিজাত এলাকা থেকে শুরু করে গ্রামীণ জনপদ পর্যন্ত এর বিস্তার ঘটেছে। ফলে মাদক আর কোনো বিশেষ শ্রেণি বা অঞ্চলের সমস্যা নয়; এটি এখন জাতীয় সমস্যা।

ইয়াবার বিস্তারকে শুধু আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে। এর পেছনে রয়েছে বহুমাত্রিক সামাজিক বাস্তবতা। বেকারত্ব, হতাশা, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, মানসিক চাপ, সামাজিক অনিশ্চয়তা এবং দ্রুত সাফল্য অর্জনের সংস্কৃতি তরুণদের একাংশকে ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অনেক তরুণ প্রথমে কৌতূহলবশত বা বন্ধুর প্ররোচনায় মাদক গ্রহণ করে। পরে সেটিই নেশায় পরিণত হয়। একসময় সে বুঝতে পারে, মাদক আর তার নিয়ন্ত্রণে নেই; বরং সে নিজেই মাদকের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বহুবার সতর্ক করেছে, মাদকাসক্তি শুধু ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়; এটি একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি মাদকাসক্ত হলে তার ক্ষতি শুধু তার নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে পরিবার, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি এবং সামাজিক সম্পর্কের ওপর।

বাংলাদেশেও সেই বাস্তবতা স্পষ্ট। মাদকাসক্ত একজন তরুণ যখন ধীরে ধীরে পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি পরিবার। যখন সে কর্মক্ষমতা হারায়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় অর্থনীতি। যখন সে অপরাধের পথে জড়িয়ে পড়ে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমাজের নিরাপত্তা। অর্থাৎ একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তির পেছনে থাকে বহুস্তরীয় সামাজিক ক্ষতির গল্প।

ইয়াবা অর্থনীতির জন্যও এক নীরব রক্তক্ষরণ। মাদক কিনতে গিয়ে অসংখ্য পরিবার তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করছে। কেউ সঞ্চয় ভাঙছে, কেউ জমি বিক্রি করছে, কেউ ঋণের বোঝা কাঁধে নিচ্ছে। মাদকাসক্ত সন্তানের চিকিৎসা করাতে গিয়ে অনেক পরিবার আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। এই ক্ষতির কোনো সরকারি হিসাব নেই, কিন্তু বাস্তবতা সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে।

পোড়া টাকার নোটের ঘটনাটিও অর্থনীতির এই অদৃশ্য ক্ষতির প্রতীক। একটি রাষ্ট্রের মুদ্রা কেবল কাগজ নয়; এটি অর্থনৈতিক আস্থার প্রতীক। সেই মুদ্রাই যখন মাদক সেবনের সরঞ্জামে পরিণত হয়, তখন বিষয়টি শুধু একটি নোটের ক্ষতি নয়; এটি সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়েরও প্রতীক হয়ে ওঠে।

মাদক ও অপরাধের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই দেখা গেছে, মাদকাসক্তি এবং অপরাধ পরস্পরকে শক্তিশালী করে। ইয়াবা সেবনের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে অনেকে চুরি, ছিনতাই, প্রতারণা কিংবা সহিংস অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। আবার মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে শক্তিশালী অপরাধচক্র। ফলে মাদক শুধু স্বাস্থ্যগত সংকট নয়; এটি আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি।

তবে মাদক সমস্যার সবচেয়ে করুণ দিক সম্ভবত এর মানবিক মূল্য। একটি পরিবারের কাছে একজন সন্তানের মাদকাসক্ত হয়ে পড়া অনেক সময় মৃত্যুসংবাদের চেয়েও বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে। কারণ সে তখন বেঁচে থাকে, কিন্তু ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে। পরিবারের সদস্যরা প্রতিদিন তাকে চোখের সামনে ভেঙে পড়তে দেখেন। তাদের অসহায়ত্বের কোনো পরিসংখ্যান হয় না, কোনো শিরোনামও হয় না।

মাদকবিরোধী অভিযানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন নেই। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগের কার্যকরতা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু শুধু অভিযান দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। গত কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা অন্তত সে কথাই বলে।

প্রয়োজন প্রতিরোধমূলক সামাজিক ব্যবস্থা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বৃদ্ধি, তরুণদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং পরিবারভিত্তিক নজরদারি- এসব উদ্যোগ সমান গুরুত্বপূর্ণ। একজন তরুণ কেন মাদকের দিকে ঝুঁকছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। কারণ সমস্যার শিকড় অক্ষত রেখে শুধু ডালপালা ছাঁটলে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

সমাজ হিসেবেও আমাদের আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। আমরা কি তরুণদের জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছি, যেখানে তারা হতাশার বদলে আশার গল্প খুঁজে পাবে? আমরা কি পরিবারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিংবা সামাজিক পরিসরে তাদের জন্য পর্যাপ্ত মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করতে পেরেছি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে না পেলে মাদকবিরোধী লড়াই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

একটি পোড়া টাকার নোট তাই আমাদের কাছে কেবল একটি ক্ষতিগ্রস্ত মুদ্রা নয়। এটি এক ধরনের সতর্কবার্তা। এমন এক সতর্কবার্তা, যা আমাদের জানিয়ে দেয়- সমস্যা শুধু সীমান্তে নয়, শুধু কোনো অপরাধচক্রে নয়; সমস্যার শিকড় সমাজের ভেতরেও বিস্তৃত।

ইয়াবার ধোঁয়া যখন একটি টাকার নোটকে পুড়িয়ে দেয়, তখন সেই ধোঁয়া আসলে আমাদের সামাজিক বাস্তবতার ওপরও একটি কালো ছাপ ফেলে যায়। সেই ছাপ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব নয়; এটি পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং নাগরিক- সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।

নইলে হয়তো আগামী দিনে আরও অনেক পোড়া নোট আমাদের হাতে আসবে। কিন্তু তখন প্রশ্ন হবে, পুড়েছে কি শুধু নোট? নাকি ধীরে ধীরে পুড়ে গ