ঢাকা ১১:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ২১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ নেই, নাকি বদলে গেছে তাদের চেহারা?

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৮:৩৯:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬
  • ৩৬ Time View
Print

মোঃ শফিকুর রহমান ঢাকা জেলা প্রতিনিধি রাজধানী ঢাকা আবারও আলোচনায়। খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনের সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড নতুন করে সামনে এনেছে পুরোনো এক প্রশ্ন- এই শহরে কি সত্যিই আর ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ নেই, নাকি তারা কেবল আড়ালে থেকে নতুন রূপে সক্রিয়? ঢাকা মহানগর পুলিশের দাবি, এখন আর আগের মতো শীর্ষ সন্ত্রাসী নেই। যারা আছে, তারা মূলত পুরোনোদের সহযোগী বা সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে চাওয়া কিছু ব্যক্তি। কথাটি আশাব্যঞ্জক শোনালেও বাস্তবতার সঙ্গে তার পুরোপুরি মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন। কারণ অপরাধ জগতের একটি স্বাভাবিক নিয়ম হলো- শূন্যতা দীর্ঘদিন থাকে না। এক পক্ষ সরে গেলে অন্য কেউ সেই জায়গা দখল করে। নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে ২০০০-এর দশকের শুরু পর্যন্ত সময়ে রাজধানীতে সন্ত্রাসের যে চিত্র দেখা গেছে, তা এখনকার প্রজন্মের কাছে অনেকটাই ইতিহাস। তখন এলাকাভিত্তিক আধিপত্য, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব- সব মিলিয়ে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ছিল এক ভয়ংকর বাস্তবতা। ২০০১ সালে ২৩ জনকে তালিকাভুক্ত করে ধরার জন্য পুরস্কার ঘোষণার ঘটনা ছিল সেই সময়ের একটি বড় পদক্ষেপ। সময়ের সঙ্গে সেই তালিকার অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছেন, কেউ দীর্ঘদিন কারাগারে থেকেছেন, কেউ আবার জামিনে বা অন্য প্রক্রিয়ায় মুক্তি পেয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে এদের কয়েকজনের মুক্তি এবং পুনরায় আলোচনায় আসা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রশ্ন উঠছে- আইনের প্রয়োগ কি কেবল সাময়িক নিয়ন্ত্রণেই সীমাবদ্ধ ছিল? অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, ঢাকার অপরাধ জগত এখন আর আগের মতো একক নেতৃত্বনির্ভর নয়। বরং এটি এখন ছোট ছোট গোষ্ঠী, বিচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক ও অস্থায়ী জোটের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ধারণাটি আগের মতো স্পষ্ট নয়, কিন্তু সন্ত্রাসের উপস্থিতি অস্বীকার করার সুযোগও নেই। এই পরিবর্তনের বড় একটি উৎস হিসেবে উঠে আসছে কিশোর গ্যাং। বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা এসব গোষ্ঠী প্রথমে নিজেদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার বা আধিপত্যের লড়াইয়ে জড়ায়। এরপর ধীরে ধীরে তারা ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক পরিবহনসহ নানা অপরাধে যুক্ত হয়। এদের মধ্য থেকেই কেউ কেউ বড় অপরাধ চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওঠে। অপরাধ জগতের আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো পৃষ্ঠপোষকতা। অভিযোগ আছে, বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিজেদের স্বার্থে এসব গোষ্ঠীকে ব্যবহার করেন। এতে অপরাধীরা শুধু অপরাধী হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; তারা হয়ে ওঠে ক্ষমতার একটি অনানুষ্ঠানিক অংশ। যদিও এসব অভিযোগ সবসময় প্রমাণ করা কঠিন, তবু এর উপস্থিতি অস্বীকার করা যায় না। কারাগারের ভূমিকাও এখানে প্রশ্নের মুখে পড়ে। বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কারাগারে থাকা অবস্থাতেও কিছু সন্ত্রাসী তাদের নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেছে। ফলে কেবল গ্রেপ্তার বা আটক করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। পুনর্বাসন ও সংশোধনের কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়া অপরাধ দমন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না। পুলিশ বলছে, তারা প্রতিরোধমূলক নানা উদ্যোগ নিচ্ছে- কমিউনিটি পুলিশিং, জনসচেতনতা, কাউন্সেলিং ইত্যাদি। কিন্তু এসব উদ্যোগের সফলতা পরিমাপ করা সহজ নয়। অপরাধ কমেছে, নাকি কেবল রূপ বদলেছে- এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর মেলে না। এখানেই পরিবার ও সমাজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একজন কিশোর হঠাৎ করে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে না। এর পেছনে থাকে পারিবারিক অবহেলা, দিকনির্দেশনার অভাব, সামাজিক বৈষম্য কিংবা ভুল সঙ্গ। পরিবার ও সমাজ যদি শুরু থেকেই সচেতন থাকে, তাহলে অনেক ক্ষেত্রেই এই প্রবণতা ঠেকানো সম্ভব। অপরাধের সঙ্গে অর্থনৈতিক বাস্তবতার সম্পর্কও গভীর। দ্রুত নগরায়ন, বেকারত্ব, বৈষম্য- এসবই অপরাধ বৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। যখন বৈধ পথে উন্নতির সুযোগ সীমিত হয়, তখন অবৈধ পথ অনেকের কাছে সহজ মনে হয়। বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- অপরাধের পরিবর্তিত রূপকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা। শুধু পুরোনো তালিকা হালনাগাদ করলেই হবে না; নতুন প্রজন্মের অপরাধ প্রবণতাকে বুঝে সেই অনুযায়ী কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। ঢাকায় হয়তো আগের মতো দৃশ্যমান ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ নেই। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সন্ত্রাসের হুমকি কমে গেছে। বরং এটি এখন আরও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, জটিল এবং অনেক ক্ষেত্রে অদৃশ্য। খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনের মৃত্যু সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে এনে দিয়েছে। প্রশ্নটি তাই থেকেই যায়- আমরা কি কেবল নামের তালিকা বদলাব, নাকি সেই প্রক্রিয়াটিকে বদলানোর চেষ্টা করব, যেখান থেকে সন্ত্রাসীর জন্ম হয়? ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ লেখক সাংবাদিক কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

Tag :
About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

নতুন কুঁড়ির ঝলক: ৬৪ জেলায় প্রতিভার বিস্ফোরণ, মাঠ মাতাচ্ছে ভবিষ্যতের তারকারা”

‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ নেই, নাকি বদলে গেছে তাদের চেহারা?

Update Time : ০৮:৩৯:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬
Print

মোঃ শফিকুর রহমান ঢাকা জেলা প্রতিনিধি রাজধানী ঢাকা আবারও আলোচনায়। খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনের সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড নতুন করে সামনে এনেছে পুরোনো এক প্রশ্ন- এই শহরে কি সত্যিই আর ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ নেই, নাকি তারা কেবল আড়ালে থেকে নতুন রূপে সক্রিয়? ঢাকা মহানগর পুলিশের দাবি, এখন আর আগের মতো শীর্ষ সন্ত্রাসী নেই। যারা আছে, তারা মূলত পুরোনোদের সহযোগী বা সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে চাওয়া কিছু ব্যক্তি। কথাটি আশাব্যঞ্জক শোনালেও বাস্তবতার সঙ্গে তার পুরোপুরি মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন। কারণ অপরাধ জগতের একটি স্বাভাবিক নিয়ম হলো- শূন্যতা দীর্ঘদিন থাকে না। এক পক্ষ সরে গেলে অন্য কেউ সেই জায়গা দখল করে। নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে ২০০০-এর দশকের শুরু পর্যন্ত সময়ে রাজধানীতে সন্ত্রাসের যে চিত্র দেখা গেছে, তা এখনকার প্রজন্মের কাছে অনেকটাই ইতিহাস। তখন এলাকাভিত্তিক আধিপত্য, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব- সব মিলিয়ে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ছিল এক ভয়ংকর বাস্তবতা। ২০০১ সালে ২৩ জনকে তালিকাভুক্ত করে ধরার জন্য পুরস্কার ঘোষণার ঘটনা ছিল সেই সময়ের একটি বড় পদক্ষেপ। সময়ের সঙ্গে সেই তালিকার অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছেন, কেউ দীর্ঘদিন কারাগারে থেকেছেন, কেউ আবার জামিনে বা অন্য প্রক্রিয়ায় মুক্তি পেয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে এদের কয়েকজনের মুক্তি এবং পুনরায় আলোচনায় আসা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রশ্ন উঠছে- আইনের প্রয়োগ কি কেবল সাময়িক নিয়ন্ত্রণেই সীমাবদ্ধ ছিল? অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, ঢাকার অপরাধ জগত এখন আর আগের মতো একক নেতৃত্বনির্ভর নয়। বরং এটি এখন ছোট ছোট গোষ্ঠী, বিচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক ও অস্থায়ী জোটের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ধারণাটি আগের মতো স্পষ্ট নয়, কিন্তু সন্ত্রাসের উপস্থিতি অস্বীকার করার সুযোগও নেই। এই পরিবর্তনের বড় একটি উৎস হিসেবে উঠে আসছে কিশোর গ্যাং। বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা এসব গোষ্ঠী প্রথমে নিজেদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার বা আধিপত্যের লড়াইয়ে জড়ায়। এরপর ধীরে ধীরে তারা ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক পরিবহনসহ নানা অপরাধে যুক্ত হয়। এদের মধ্য থেকেই কেউ কেউ বড় অপরাধ চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওঠে। অপরাধ জগতের আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো পৃষ্ঠপোষকতা। অভিযোগ আছে, বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিজেদের স্বার্থে এসব গোষ্ঠীকে ব্যবহার করেন। এতে অপরাধীরা শুধু অপরাধী হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; তারা হয়ে ওঠে ক্ষমতার একটি অনানুষ্ঠানিক অংশ। যদিও এসব অভিযোগ সবসময় প্রমাণ করা কঠিন, তবু এর উপস্থিতি অস্বীকার করা যায় না। কারাগারের ভূমিকাও এখানে প্রশ্নের মুখে পড়ে। বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কারাগারে থাকা অবস্থাতেও কিছু সন্ত্রাসী তাদের নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেছে। ফলে কেবল গ্রেপ্তার বা আটক করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। পুনর্বাসন ও সংশোধনের কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়া অপরাধ দমন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না। পুলিশ বলছে, তারা প্রতিরোধমূলক নানা উদ্যোগ নিচ্ছে- কমিউনিটি পুলিশিং, জনসচেতনতা, কাউন্সেলিং ইত্যাদি। কিন্তু এসব উদ্যোগের সফলতা পরিমাপ করা সহজ নয়। অপরাধ কমেছে, নাকি কেবল রূপ বদলেছে- এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর মেলে না। এখানেই পরিবার ও সমাজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একজন কিশোর হঠাৎ করে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে না। এর পেছনে থাকে পারিবারিক অবহেলা, দিকনির্দেশনার অভাব, সামাজিক বৈষম্য কিংবা ভুল সঙ্গ। পরিবার ও সমাজ যদি শুরু থেকেই সচেতন থাকে, তাহলে অনেক ক্ষেত্রেই এই প্রবণতা ঠেকানো সম্ভব। অপরাধের সঙ্গে অর্থনৈতিক বাস্তবতার সম্পর্কও গভীর। দ্রুত নগরায়ন, বেকারত্ব, বৈষম্য- এসবই অপরাধ বৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। যখন বৈধ পথে উন্নতির সুযোগ সীমিত হয়, তখন অবৈধ পথ অনেকের কাছে সহজ মনে হয়। বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- অপরাধের পরিবর্তিত রূপকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা। শুধু পুরোনো তালিকা হালনাগাদ করলেই হবে না; নতুন প্রজন্মের অপরাধ প্রবণতাকে বুঝে সেই অনুযায়ী কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। ঢাকায় হয়তো আগের মতো দৃশ্যমান ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ নেই। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সন্ত্রাসের হুমকি কমে গেছে। বরং এটি এখন আরও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, জটিল এবং অনেক ক্ষেত্রে অদৃশ্য। খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনের মৃত্যু সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে এনে দিয়েছে। প্রশ্নটি তাই থেকেই যায়- আমরা কি কেবল নামের তালিকা বদলাব, নাকি সেই প্রক্রিয়াটিকে বদলানোর চেষ্টা করব, যেখান থেকে সন্ত্রাসীর জন্ম হয়? ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ লেখক সাংবাদিক কলামিস্ট ও বিশ্লেষক