
মোঃ ইউনুছ মিয়া , মুরাদনগর (কুমিল্লা) প্রতিনিধি কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় বর্তমানে কোনো সরকারি কলেজ নেই। বৃহত্তর মুরাদনগরের একমাত্র সরকারি কলেজ শ্রীকাইল সরকারি কলেজ প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ফলে বাঙ্গরা উপজেলার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় মুরাদনগরের শিক্ষার্থীদের সামনে সরকারি উচ্চশিক্ষার সুযোগ আরও সীমিত হয়ে পড়েছে। এমন বাস্তবতায় দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী বদিউল আলম কলেজকে সরকারিকরণের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, মুরাদনগরের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে বদিউল আলম কলেজ সরকারিকরণ এখন সময়ের দাবি। তাঁদের মতে, নতুন করে একটি সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠার চেয়ে বিদ্যমান অবকাঠামো, জমি, শিক্ষকতা কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীসংখ্যা থাকা এই প্রতিষ্ঠানটিকে সরকারিকরণ করাই হতে পারে দ্রুত ও বাস্তবসম্মত সমাধান। মুরাদনগর উপজেলার ভৌগোলিক বিস্তৃতি বড়। উপজেলার উত্তরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা আগে শ্রীকাইল সরকারি কলেজের সুবিধা পেলেও প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর প্রতিষ্ঠানটি বাঙ্গরা উপজেলার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ফলে মুরাদনগরের দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সরকারি কলেজে পড়াশোনার সুযোগ পেতে এখন আরও দূরত্ব অতিক্রম করতে হচ্ছে। দূরত্বের পাশাপাশি যাতায়াত ব্যয়, থাকা-খাওয়ার খরচ এবং পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা সব মিলিয়ে অনেক শিক্ষার্থীর জন্য উচ্চশিক্ষা হয়ে উঠছে কঠিন। বিশেষ করে নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীরা এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বদিউল আলম কলেজে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে বলে প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সরকারিকরণ হলে এসব শিক্ষার্থী তুলনামূলক কম ব্যয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবে। শুধু বর্তমান শিক্ষার্থীরাই নয়, প্রতিবছর মুরাদনগর ও আশপাশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করা শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশও এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরকারি উচ্চশিক্ষার আওতায় আসতে পারে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি কলেজকে সরকারি করা মানে শুধু প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি অঞ্চলের হাজারো পরিবারের শিক্ষাব্যয় কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ। বদিউল আলম কলেজে হিসাববিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, সমাজকর্ম, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও বাংলা বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, মুরাদনগরের অন্য কলেজগুলোতে এসব বিষয়ে অনার্স পড়ার সুযোগ না থাকায় বদিউল আলম কলেজটি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ফলে কলেজটি সরকারিকরণ হলে শুধু সাধারণ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থী নয়, অনার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থীরাও সরকারি উচ্চশিক্ষার সুযোগের আওতায় আসবে। এতে মুরাদনগরে উচ্চশিক্ষার পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি আর্থিক সক্ষমতা। বেসরকারি কলেজের ভর্তি ফি, মাসিক বেতন, ফরম পূরণ, পরীক্ষার ফি, যাতায়াতসহ বিভিন্ন ব্যয় অনেক পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। ফলে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ভালো ফল করেও অনেক শিক্ষার্থী স্নাতক পর্যায়ে ভর্তি হতে পারে না। কেউ কেউ ভর্তি হলেও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে মাঝপথে পড়াশোনা বন্ধ করে দেয়। স্থানীয়দের মতে, বদিউল আলম কলেজ সরকারিকরণ হলে এই শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার দরজা আরও উন্মুক্ত হবে। বিশেষ করে দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ বাড়বে এবং উচ্চশিক্ষায় ঝরে পড়ার প্রবণতা কমানো সম্ভব হবে। বদিউল আলম কলেজ প্রায় ১০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এই বিশাল জমি সরকারিকরণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হতে পারে। কারণ নতুন করে সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণ, ভবন নির্মাণ, শ্রেণিকক্ষ, প্রশাসনিক ভবন, খেলার মাঠসহ বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরিতে বিপুল অর্থ ও সময় প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে বদিউল আলম কলেজে ইতোমধ্যে বিদ্যমান অবকাঠামো ও শিক্ষা কার্যক্রম রয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ও সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করে প্রতিষ্ঠানটি সরকারিকরণ করা গেলে নতুন করে শূন্য থেকে একটি কলেজ গড়ে তোলার তুলনায় সময় ও সরকারি অর্থ দুই ক্ষেত্রেই সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বদিউল আলম কলেজের ইতিহাসও দীর্ঘ। ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি মুরাদনগরের শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা রেখে আসছে। কয়েক দশকের পথচলায় এই প্রতিষ্ঠান থেকে বহু শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। ফলে স্থানীয়দের কাছে এটি কেবল একটি কলেজ নয় মুরাদনগরের শিক্ষা ও সামাজিক অগ্রযাত্রার দীর্ঘ ইতিহাসেরও অংশ। মুরাদনগরের মতো বড় একটি উপজেলায় সরকারি কলেজ না থাকা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসনিক সীমানা পরিবর্তনের পর যখন মুরাদনগরের শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি উচ্চশিক্ষার সুযোগ আরও সংকুচিত হয়েছে, তখন নতুন বাস্তবতায় একটি সরকারি কলেজের প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় স্থানীয়দের প্রশ্ন নতুন করে সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হবে, নাকি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী ও শিক্ষার্থীসমৃদ্ধ একটি বিদ্যমান কলেজকে সরকারিকরণের মাধ্যমে দ্রুত সমস্যার সমাধান করা হবে? বদিউল আলম কলেজের সরকারিকরণের পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের যুক্তি, বিদ্যমান জমি, অবকাঠামো, শিক্ষার্থী ও দীর্ঘদিনের শিক্ষা কার্যক্রম বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানটিকে সরকারিকরণ করাই হতে পারে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ। বদিউল আলম কলেজ সরকারিকরণের দাবি এখন আর শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের দাবি হিসেবে দেখছেন না স্থানীয়রা। তাঁদের মতে, এটি মুরাদনগরের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সরকারি উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি। তাঁদের ভাষায়, একটি অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা শুধু ভৌগোলিক অবস্থান বা পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের কারণে সরকারি উচ্চশিক্ষা থেকে পিছিয়ে থাকবে এটি কাম্য নয়। শিক্ষার সুযোগে বৈষম্য কমাতে হলে প্রত্যন্ত ও বৃহৎ উপজেলা পর্যায়ে সরকারি উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান থাকা জরুরি। সবকিছু বিবেচনায় স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বদিউল আলম কলেজের অবকাঠামো, জমি, শিক্ষার্থীসংখ্যা, অনার্স কার্যক্রম, শিক্ষার মান ও দীর্ঘদিনের অবদানসহ সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে সরকারিকরণের বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেবে। মুরাদনগরের মানুষের দাবি তাই স্পষ্ট বদিউল আলম কলেজ সরকারিকরণ চাই। শিক্ষার সুযোগে বৈষম্য নয়, চাই সমান অধিকার। কারণ শিক্ষা কোনো বিশেষ শ্রেণির সুযোগ নয় এটি সবার অধিকার।
Reporter Name 


















