ঢাকা ০৪:৫০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাবার লাশ বাড়িতে রেখে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিলেন আয়েশা, চোখের জলেই লিখলেন উত্তরপত্র

  • Reporter Name
  • Update Time : ০২:২১:৫৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
  • ৪২ Time View
Print

 

 

 

নিজস্ব প্রতিবেদক:– যে বাবার হাত ধরে জীবনের প্রথম স্কুলে যাওয়া, যে বাবা প্রতিটি পরীক্ষার আগের রাতে সন্তানের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন থাকতেন—সেই বাবার নিথর দেহ বাড়িতে রেখে এইচএসসি পরীক্ষার হলে বসতে হয়েছে আয়েশা সিদ্দিকা মৌকে। এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য উপস্থিত সবাইকে আবেগাপ্লুত করেছে।

জানা গেছে, মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) দুপুরে ফুসফুসের জটিলতাজনিত অসুস্থতায় রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আয়েশার বাবা মিজানুর রহমান ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

পরদিন বুধবার (২৯ জুলাই) সকাল ১০টায় শুরু হয় এইচএসসি পরীক্ষার জীববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র। শোকাহত পরিবারের বুকভাঙা কান্নার মধ্যেই বাবার মরদেহ বাড়িতে রেখে পরীক্ষাকেন্দ্রে উপস্থিত হন আয়েশা।

পরীক্ষা শেষে কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসতেই আর নিজেকে সামলে রাখতে পারেননি তিনি। দুই চোখ বেয়ে ঝরতে থাকে বাবাকে হারানোর অসহনীয় বেদনার অশ্রু। সহপাঠীরা তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেন এবং ভ্যানগাড়িতে করে বাড়িতে পৌঁছে দেন।

হৃদয়স্পর্শী এই ঘটনাটি ঘটেছে নওগাঁ জেলার পত্নীতলা উপজেলায়।

আয়েশা সিদ্দিকা মৌ নজিপুর সরকারি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। তাঁর বাবা মিজানুর রহমান ধামইরহাট উপজেলার গাংরা ইসলামিয়া বালিকা আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ছিলেন। পরিবারটি বর্তমানে পত্নীতলা উপজেলার নজিপুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ঈদগাহপাড়া এলাকায় বসবাস করত। বুধবার সকাল সাড়ে ৯টায় ধামইরহাট উপজেলার মঙ্গলবাড়িতে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।

স্বজনরা জানান, বাবার মৃত্যুতে আয়েশা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিলেন। তবে পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের অনুপ্রেরণায় তিনি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। বর্তমানে পুরো পরিবার গভীর শোকের মধ্যে রয়েছে।

আয়েশার সহপাঠীরা বলেন, “আমাদের প্রিয় বন্ধু মৌ আজ জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়—তার বাবাকে হারিয়েছে। এই শোক ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমরা মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন তাঁর বাবাকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করেন এবং মৌ ও তাঁর পরিবারকে এই শোক সহ্য করার শক্তি দান করেন। আমিন।”

নজিপুর মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও পরীক্ষাকেন্দ্রের কেন্দ্র সচিব মিজানুর রহমান বলেন, “পরীক্ষার্থী আয়েশা সিদ্দিকার বাবার মৃত্যুর বিষয়টি আমরা জানতাম। পরীক্ষার পুরো সময় তাকে এক হাতে চোখের জল মুছতে এবং অন্য হাতে উত্তরপত্র লিখতে দেখেছি। দৃশ্যটি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ছিল। আমরা তাকে মানসিকভাবে সাহস জুগিয়েছি এবং পরীক্ষা সম্পন্ন করতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছি।”

একজন শিক্ষার্থীর জীবনে পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বাবাকে হারানোর শোকের ভার বহন করে পরীক্ষার হলে বসা নিঃসন্দেহে অসীম মানসিক শক্তি ও আত্মত্যাগের এক বিরল দৃষ্টান্ত। আয়েশার এই সংগ্রাম শুধু একটি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার গল্প নয়; এটি একজন সন্তানের দায়িত্ববোধ, সাহস এবং জীবনের কঠিন বাস্তবতার এক বেদনাময় প্রতিচ্ছবি, যা যে কোনো মানুষের হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করবে।

Tag :
About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

কুখ্যাত মাদক কারবারী রবিউল হাসান সহযোগীসহ গ্রেফতার, ১ হাজার ৮০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার।

বাবার লাশ বাড়িতে রেখে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিলেন আয়েশা, চোখের জলেই লিখলেন উত্তরপত্র

Update Time : ০২:২১:৫৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
Print

 

 

 

নিজস্ব প্রতিবেদক:– যে বাবার হাত ধরে জীবনের প্রথম স্কুলে যাওয়া, যে বাবা প্রতিটি পরীক্ষার আগের রাতে সন্তানের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন থাকতেন—সেই বাবার নিথর দেহ বাড়িতে রেখে এইচএসসি পরীক্ষার হলে বসতে হয়েছে আয়েশা সিদ্দিকা মৌকে। এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য উপস্থিত সবাইকে আবেগাপ্লুত করেছে।

জানা গেছে, মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) দুপুরে ফুসফুসের জটিলতাজনিত অসুস্থতায় রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আয়েশার বাবা মিজানুর রহমান ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

পরদিন বুধবার (২৯ জুলাই) সকাল ১০টায় শুরু হয় এইচএসসি পরীক্ষার জীববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র। শোকাহত পরিবারের বুকভাঙা কান্নার মধ্যেই বাবার মরদেহ বাড়িতে রেখে পরীক্ষাকেন্দ্রে উপস্থিত হন আয়েশা।

পরীক্ষা শেষে কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসতেই আর নিজেকে সামলে রাখতে পারেননি তিনি। দুই চোখ বেয়ে ঝরতে থাকে বাবাকে হারানোর অসহনীয় বেদনার অশ্রু। সহপাঠীরা তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেন এবং ভ্যানগাড়িতে করে বাড়িতে পৌঁছে দেন।

হৃদয়স্পর্শী এই ঘটনাটি ঘটেছে নওগাঁ জেলার পত্নীতলা উপজেলায়।

আয়েশা সিদ্দিকা মৌ নজিপুর সরকারি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। তাঁর বাবা মিজানুর রহমান ধামইরহাট উপজেলার গাংরা ইসলামিয়া বালিকা আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ছিলেন। পরিবারটি বর্তমানে পত্নীতলা উপজেলার নজিপুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ঈদগাহপাড়া এলাকায় বসবাস করত। বুধবার সকাল সাড়ে ৯টায় ধামইরহাট উপজেলার মঙ্গলবাড়িতে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।

স্বজনরা জানান, বাবার মৃত্যুতে আয়েশা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিলেন। তবে পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের অনুপ্রেরণায় তিনি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। বর্তমানে পুরো পরিবার গভীর শোকের মধ্যে রয়েছে।

আয়েশার সহপাঠীরা বলেন, “আমাদের প্রিয় বন্ধু মৌ আজ জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়—তার বাবাকে হারিয়েছে। এই শোক ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমরা মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন তাঁর বাবাকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করেন এবং মৌ ও তাঁর পরিবারকে এই শোক সহ্য করার শক্তি দান করেন। আমিন।”

নজিপুর মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও পরীক্ষাকেন্দ্রের কেন্দ্র সচিব মিজানুর রহমান বলেন, “পরীক্ষার্থী আয়েশা সিদ্দিকার বাবার মৃত্যুর বিষয়টি আমরা জানতাম। পরীক্ষার পুরো সময় তাকে এক হাতে চোখের জল মুছতে এবং অন্য হাতে উত্তরপত্র লিখতে দেখেছি। দৃশ্যটি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ছিল। আমরা তাকে মানসিকভাবে সাহস জুগিয়েছি এবং পরীক্ষা সম্পন্ন করতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছি।”

একজন শিক্ষার্থীর জীবনে পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বাবাকে হারানোর শোকের ভার বহন করে পরীক্ষার হলে বসা নিঃসন্দেহে অসীম মানসিক শক্তি ও আত্মত্যাগের এক বিরল দৃষ্টান্ত। আয়েশার এই সংগ্রাম শুধু একটি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার গল্প নয়; এটি একজন সন্তানের দায়িত্ববোধ, সাহস এবং জীবনের কঠিন বাস্তবতার এক বেদনাময় প্রতিচ্ছবি, যা যে কোনো মানুষের হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করবে।