ঢাকা ০৭:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টেকনাফের দীর্ঘ ছায়া: ভয়ের রাত, কান্নার জনপদ আর এক বিচার-অপেক্ষার গল্প

  • Reporter Name
  • Update Time : ১২:৩৬:৫৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
  • ১৭ Time View
Print

ফরহাদ রহমান,স্টাফ রিপোর্টার কক্সবাজার

একটা সময় ছিল, টেকনাফ থানার নাম শুনলেই অনেকের বুকের ভেতর কাঁপন ধরত। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে অনেক পরিবার দরজা-জানালা বন্ধ করে দিত। কারও ছেলে রাতে বাড়ি ফিরতে দেরি করলে মায়ের চোখে ঘুম আসত না। কেউ ফোন ধরছে না-এমন খবরই হয়ে উঠত আতঙ্কের শুরু।

টেকনাফের অলিগলি, পাহাড়, সমুদ্রতীর আর সীমান্তজুড়ে তখন প্রায় প্রতিদিনই শোনা যেত ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ার’-এর খবর। সকালে জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশ হতো-অমুক ব্যক্তি বন্দুকযুদ্ধে নিহত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, নিহতদের বিরুদ্ধে মাদক বা অস্ত্র-সংশ্লিষ্ট অভিযোগ থাকত। কিন্তু একই সময়ে বহু পরিবার দাবি করত, তাদের স্বজন নির্দোষ ছিলেন অথবা ঘটনার প্রকৃত তদন্ত হয়নি। এসব অভিযোগের অনেকগুলোর বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।

স্থানীয় মানুষের ভাষায়, সেই সময়টা ছিল এক অনিশ্চয়তার সময়। কে কখন গ্রেপ্তার হবেন, কার বিরুদ্ধে মামলা হবে, কিংবা কার মৃত্যুর খবর আসবে-এ নিয়ে ভয় ছিল অনেকের মধ্যে। টেকনাফের চা-স্টল থেকে বাজার, জেলেপাড়া থেকে পাহাড়ি জনপদ-সর্বত্র একই আলোচনা চলত।

এই সময়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন টেকনাফ থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ। তাঁর বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে নানা অভিযোগ সামনে আসে। বিভিন্ন ভুক্তভোগী পরিবার, মানবাধিকারকর্মী এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মিথ্যা মামলা, হয়রানি, নির্যাতন, চাঁদাবাজি এবং কথিত ক্রসফায়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। তবে এসব অভিযোগের সবগুলো আদালতে প্রমাণিত নয় এবং অনেক বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া চলমান বা সম্পন্ন হয়নি।

টেকনাফের বহু পরিবার আজও তাদের হারানো স্বজনের কথা স্মরণ করে। কেউ বাবাকে হারিয়েছেন, কেউ ভাইকে, কেউ সন্তানের মৃত্যুতে আজও শোক বহন করছেন। তাদের অনেকেরই দাবি-তারা সত্য জানতে চান, ন্যায়বিচার চান। আবার অন্যদিকে, আইন অনুযায়ী প্রত্যেক অভিযুক্ত ব্যক্তিরও বিচারিক প্রক্রিয়ার অধিকার রয়েছে।

২০২০ সালের ৩১ জুলাই অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যাকাণ্ডের পর পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। এই ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। তদন্ত, বিচার এবং আদালতের রায়ের মধ্য দিয়ে মামলাটি বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত বিচারিক ঘটনায় পরিণত হয়। বিচারিক আদালত ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, এ ধরনের রায় চূড়ান্ত কার্যকর হওয়ার আগে উচ্চ আদালতের আপিল ও অন্যান্য আইনি ধাপ সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন।

আজও সিনহা পরিবারের জন্য বিচার মানে শুধু একটি রায় নয়; বরং বিচারিক প্রক্রিয়ার পূর্ণ সমাপ্তি। একইভাবে, টেকনাফের অনেক মানুষও অতীতের বিতর্কিত ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ মূল্যায়ন এবং সত্য উদ্ঘাটনের প্রত্যাশা করেন।

টেকনাফের ইতিহাসে সেই সময়টি এখনো বিতর্ক, বেদনা এবং বিচার-প্রত্যাশার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একদিকে রাষ্ট্রের অপরাধ দমনের দায়িত্ব, অন্যদিকে আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং জবাবদিহির প্রশ্ন-এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষাই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে টিকে থাকে ক্ষমতা নয়, বিচার। আর টেকনাফের অসংখ্য পরিবার-যারা প্রিয়জন হারিয়েছেন, কিংবা দীর্ঘদিন ভয়ের মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন-তাদের প্রত্যাশা একটাই: প্রতিটি অভিযোগের সত্য উদ্ঘাটিত হোক, প্রতিটি বিচার আইনের পথেই সম্পন্ন হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো জনপদকে একই ধরনের বেদনার ইতিহাস বহন করতে না হয়।

Tag :
About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

সাতক্ষীরায় ঘের থেকে যুবকের লাশ উদ্ধার ও যশোরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত -২

টেকনাফের দীর্ঘ ছায়া: ভয়ের রাত, কান্নার জনপদ আর এক বিচার-অপেক্ষার গল্প

Update Time : ১২:৩৬:৫৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
Print

ফরহাদ রহমান,স্টাফ রিপোর্টার কক্সবাজার

একটা সময় ছিল, টেকনাফ থানার নাম শুনলেই অনেকের বুকের ভেতর কাঁপন ধরত। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে অনেক পরিবার দরজা-জানালা বন্ধ করে দিত। কারও ছেলে রাতে বাড়ি ফিরতে দেরি করলে মায়ের চোখে ঘুম আসত না। কেউ ফোন ধরছে না-এমন খবরই হয়ে উঠত আতঙ্কের শুরু।

টেকনাফের অলিগলি, পাহাড়, সমুদ্রতীর আর সীমান্তজুড়ে তখন প্রায় প্রতিদিনই শোনা যেত ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ার’-এর খবর। সকালে জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশ হতো-অমুক ব্যক্তি বন্দুকযুদ্ধে নিহত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, নিহতদের বিরুদ্ধে মাদক বা অস্ত্র-সংশ্লিষ্ট অভিযোগ থাকত। কিন্তু একই সময়ে বহু পরিবার দাবি করত, তাদের স্বজন নির্দোষ ছিলেন অথবা ঘটনার প্রকৃত তদন্ত হয়নি। এসব অভিযোগের অনেকগুলোর বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।

স্থানীয় মানুষের ভাষায়, সেই সময়টা ছিল এক অনিশ্চয়তার সময়। কে কখন গ্রেপ্তার হবেন, কার বিরুদ্ধে মামলা হবে, কিংবা কার মৃত্যুর খবর আসবে-এ নিয়ে ভয় ছিল অনেকের মধ্যে। টেকনাফের চা-স্টল থেকে বাজার, জেলেপাড়া থেকে পাহাড়ি জনপদ-সর্বত্র একই আলোচনা চলত।

এই সময়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন টেকনাফ থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ। তাঁর বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে নানা অভিযোগ সামনে আসে। বিভিন্ন ভুক্তভোগী পরিবার, মানবাধিকারকর্মী এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মিথ্যা মামলা, হয়রানি, নির্যাতন, চাঁদাবাজি এবং কথিত ক্রসফায়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। তবে এসব অভিযোগের সবগুলো আদালতে প্রমাণিত নয় এবং অনেক বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া চলমান বা সম্পন্ন হয়নি।

টেকনাফের বহু পরিবার আজও তাদের হারানো স্বজনের কথা স্মরণ করে। কেউ বাবাকে হারিয়েছেন, কেউ ভাইকে, কেউ সন্তানের মৃত্যুতে আজও শোক বহন করছেন। তাদের অনেকেরই দাবি-তারা সত্য জানতে চান, ন্যায়বিচার চান। আবার অন্যদিকে, আইন অনুযায়ী প্রত্যেক অভিযুক্ত ব্যক্তিরও বিচারিক প্রক্রিয়ার অধিকার রয়েছে।

২০২০ সালের ৩১ জুলাই অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যাকাণ্ডের পর পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। এই ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। তদন্ত, বিচার এবং আদালতের রায়ের মধ্য দিয়ে মামলাটি বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত বিচারিক ঘটনায় পরিণত হয়। বিচারিক আদালত ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, এ ধরনের রায় চূড়ান্ত কার্যকর হওয়ার আগে উচ্চ আদালতের আপিল ও অন্যান্য আইনি ধাপ সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন।

আজও সিনহা পরিবারের জন্য বিচার মানে শুধু একটি রায় নয়; বরং বিচারিক প্রক্রিয়ার পূর্ণ সমাপ্তি। একইভাবে, টেকনাফের অনেক মানুষও অতীতের বিতর্কিত ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ মূল্যায়ন এবং সত্য উদ্ঘাটনের প্রত্যাশা করেন।

টেকনাফের ইতিহাসে সেই সময়টি এখনো বিতর্ক, বেদনা এবং বিচার-প্রত্যাশার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একদিকে রাষ্ট্রের অপরাধ দমনের দায়িত্ব, অন্যদিকে আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং জবাবদিহির প্রশ্ন-এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষাই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে টিকে থাকে ক্ষমতা নয়, বিচার। আর টেকনাফের অসংখ্য পরিবার-যারা প্রিয়জন হারিয়েছেন, কিংবা দীর্ঘদিন ভয়ের মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন-তাদের প্রত্যাশা একটাই: প্রতিটি অভিযোগের সত্য উদ্ঘাটিত হোক, প্রতিটি বিচার আইনের পথেই সম্পন্ন হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো জনপদকে একই ধরনের বেদনার ইতিহাস বহন করতে না হয়।